সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 238
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সিরাজগঞ্জের
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ধীরে ধীরে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে, দরিদ্রতার কারণে অনেকেই হচ্ছেন ধর্মান্তরিত।
শনিবার (৯ আগস্ট) বিশ্ব আদিবাসী দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে
বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে 'আদিবাসীদের'
শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, দরিদ্রতা, ভূমি জটিলতা আজও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া
হয়নি। নৃ-তাত্ত্বিক এই জনগোষ্ঠী কর্মহীন, অশিক্ষিত, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত আর ভূমি
বেদখলসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে তারা বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন।
সিরাজগঞ্জ
জেলার বিভিন্ন স্থানে বিছিন্নভাবে আদিবাসীদের বসবাস থাকলেও তাড়াশ-রায়গঞ্জে এদের সংখ্যা
প্রায় ৬০ হাজার। জেলায় আদিবাসী গ্রামের সংখ্যা ১০৩টি। আদিবাসীর গোত্র রয়েছে ১৪টি। আদিবাসী
মহিলা-পুরুষ মাঠে-ঘাটে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। রোগে ভোগা কঙ্কালসার শরীর
নিয়ে নারী-পুরুষ উভয়েই সমভাবে কাজ করে। অধিকাংশ পরিবার ঝাপরি, ছনের ঘর, পলিথিনের টং
ঘরে বসবাস করে। উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের একসময় অসংখ্যা গোত্র থাকলেও সময়ের ব্যবধানে
এখন ১৪টি গোত্রের খোঁজ পাওয়া যায়। এরা হলো উরাঁও, উরাঁও, মাহাতো, সাঁওতাল, বসাক, মুরারী,
তুরী, সিং, রবীদাস, রায়, মাহালি ইত্যাদি। বর্তমান আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়ার
প্রবণতা লক্ষণীয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার খ্রিষ্ট
ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আদিবাসীরা মনে করেন দরিদ্রতার কারণেই মূল ধর্ম থেকে অনেকেই
বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। আদিবাসীদের জীবন থেকে নেওয়া সংস্কৃতি আজ মিশ্র রূপ ধারণ করেছে।
তাদের নিজস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান কারাম উৎসব, ডাল পূজা, সোহরাই, এরোক, নিমদা মান্ডি, কেওহা
টানাটানি, ফাগুয়া, ডাংরি পূজা, কঠিন চিবরদান, বিশ্বকর্মা, গোয়াল পূজার পাশাপাশি সনাতন
ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এদের দেখা যায়। তবে আদিবাসীদের নিজস্ব ৫-৭টি ধর্মীয় অনুষ্ঠান
ছাড়া অনেক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বিলীন হতে চলেছে তাদের জীবন ব্যবস্থা থেকে।
আদিবাসী
নারী-পুরুষ উভয়েই মাঠে কৃষি কাজ, পশু পালন, তাঁতের কাজ, কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন কাজ করে
জীবিকা নির্বাহ করে। কালের বিবর্তনে নিজ জমি হাত ছাড়া হওয়ায় এ অঞ্চলে প্রায় ৯০ ভাগ
আদিবাসী ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। তাড়াশ-রায়গঞ্জ এলাকায় ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে প্রায় ২
শতাধিক মামলা রয়েছে। জমিজমা বিরোধের জের ধরে অনেকেই নিহত হয়েছে। আদিবাসীদের সরলতার
সুযোগ নিয়ে ভূমিগ্রাসীরা নিরীহ আদিবাসীদের দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে
এরা কায়িক শ্রমের মাধ্যমে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহের প্রাণান্তর চেষ্টা করছে।
তাছাড়া দুই উপজেলার প্রায় ৪ হাজার পরিবার বিভিন্ন এনজিওর ঋণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এক
জরিপে জানা যায় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ এখনো খাসজমিতে বসবাস করে। ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ
উধুলি বা অস্থায়ী বসবাস করে। যৌতুকের ভারে প্রতিটি পরিবার বিপর্যস্ত। শিক্ষার প্রতি
এদের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত সমাজের শোষক শ্রেণির অত্যাচার-নির্যাতনে সামাজিকভাবে
হেয়প্রতিপন্ন হওয়ায় আদিবাসীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন
সংস্থা, উরাঁও ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন এনজিও আদিবাসীদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ
করলেও তাদের সংস্কৃতি, মাতৃভাষা, কৃষ্টি, মানবাধিকার ও শিক্ষা নিয়ে কোনো কার্যকর ভূমিকা
রাখতে পারেনি। এমনকি আদিবাসীদের নামের গোত্রীয় পদবি স্কুলে ভর্তির সময়ে পরিবর্তন হয়ে
যায়। নানাভাবে অত্যাচারিত নিগৃহীত আদিবাসীরা যুগে যুগেই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে
আসছে।
তাড়াশ
উপজেলার গুল্টা বাজারের আদিবাসী পার্বতী উরাঁও, শিল্পী রানী, নির্মলা রানী উরাঁও মাঠে
কাজ করতে গিয়ে বলেন, সারাদিন কাজ করে ১৫০-২০০ টাকা পাই। এখানেও আমাদের মজুরি কম দেওয়া
হয়। ৩৬৫ দিনের বেশিরভাগ সময়ই পার্বতীরা মাঠে কৃষিকাজ করে। বাকি সময় বিলের শামুক, কাঁকড়া,
কাছিম, মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করে।
আকাশজমিন/আরআর