রূপগঞ্জ( নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
নারায়ণগঞ্জের
রূপগঞ্জে ভারী বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা, প্রচণ্ড
গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প কলকারখানা ও
আবাসিক এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পড়াশোনার জন্য মোমবাতি একমাত্র ভরসা। এ উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় আড়াই হাজার শিল্প-কল-কারখানা
রয়েছে। গত ৭ দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এসব কারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এতে
লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। শিল্প-কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঘন ঘন
লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে তাদের।
কিন্তু তাতেও শতভাগ উৎপাদন করতে পারছেন না। তারা বলছেন, এভাবে লোডশেডিং চলতে থাকলে
শিল্প-কারখানাগুলো সচল রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া উৎপাদন কমে এলে শ্রমিক কর্মচারীদের
বেতন ভাতাও কমে আসবে শঙ্কায় রয়েছেন শ্রমিক কর্মচারীরা। শিল্প কারখানার উৎপাদন শতভাগ
রাখতে শতভাগ বিদ্যুতের বিকল্প নেই।লোডশেডিং এর কারণে ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাহত
হচ্ছে। বিদ্যুতের বিকল্প মোমবাতি একমাত্র ভরসা।
জানা
গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার যাত্রামুড়া, বরাব, বরপা, তারাবো, রুপসী, মৈকুলী, ভুলতা, আড়িয়াবো,
কর্ণগোপ, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, হাটাবো, সাওঘাট, কাতরারচক, ডহরগাঁও, পাড়াগাঁও,
মুড়াপাড়া, মিঠাবো, কায়েতপাড়া, দাউদপুর ও কলিঙ্গাসহ কয়েকটি এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার
শিল্প-কারখানা রয়েছে।
এসব
কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে প্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি, থ্রিপিস, চাদর, প্রিন্ট কাপড়, লুঙ্গি,
প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যসহ হরেক রকমের জিনিসপত্র। রয়েছে নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনি শিং কারখানাও।
এর মধ্যে হারবেস্ট রিচ গার্মেন্টস, অলটেক্স, অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানা,
গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানা, ফকির ফ্যাশন, সিটি অয়েল মিল, প্রাণ-আরএফএল
কোম্পানি, ম্যাক্স সুয়েটার, রবিন টেক্স অ্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেড,সোনালি পেপার এন্ড
বোর্ড মিলস,লিঃ,আম্বার পাল্প পেপার,পেপারটেকের মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও জেনারেটর
চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি এলাকায় গ্যাসেরও
সংকট রয়েছে। তাছাড়া এভাবে সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে
যাচ্ছে।
আবাসিক
এলাকার বাসিন্দারা জানান, রূপগঞ্জ উপজেলার প্রত্যেকটি এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ। লাখ লাখ
মানুষের বসবাস। প্রচণ্ড গরম ও লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ
লোকজনের কষ্টের সীমা নেই।
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জ নরসিংদী অগ্রণী সেচ প্রকল্প ও উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে কৃত্রিম বন্যায় পরিণত হয়েছে। এসব এলাকার পানি সেচের জন্য এই দুটি প্রকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কয়েকদিনের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া পানি সেচ পাম্প ব্যবহার করে নিষ্কাশন করতে পারছেন না। ফলে জলবদ্ধ স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জনগণ। লোডশেডিংয়ের কারণে খাবার পানিরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মিঠাবো এলাকার ইউনুস গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্হাপক এমদাদুল ইসলাম সেলিম বলেন, লোডশিংয়ের কারণে কারখানা সচল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গ্যাস দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না। কারণ গ্যাসের প্রেসার একদম কম। গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আমলাব এলাকার এলাকার জুনায়েত ফ্যাশন গার্মেন্টসের ম্যানেজার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমার কারখানায় টি-শার্ট তৈরি হয়। কারখানাটি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দিনে অন্তত ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে শ্রমিক কর্মচারীরা কাজ না করে অলস সময় পার করছেন। এভাবে চলতে থাকলে লোকসানের মুখে পড়বে শিল্প কল-কলকারখার মালিকরা।
কর্মচারীরা
খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হবে। ভুলতা এলাকার ভাই ভাই এমব্রয়ডারি কারখানার মালিক আলিনুর
ব্যাপারী বলেন, একদিকে প্রচণ্ড গরম অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং। আমরা আর কুলিয়ে উঠতে পারছি
না। সরকারের কাছে এই সমস্যা সমাধানের জন্য জোর দাবি জানান এই ব্যবসায়ী। বরপা এলাকার
অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানার দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না
করে বলেন, বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে গ্যাসের মাধ্যমে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা
হয়েছে। তবে গ্যাস সঙ্কটের কারণে প্রায়ই ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়ায়
গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হয়। তারপরও শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে মালিকপক্ষ
অনেক কষ্টে কারখানা চালু রেখেছেন।
গাউছিয়া
মার্কেটের ফ্যাশন টাচ নামের কাপড় ব্যবসায়ী মোক্তার হোসেন বলেন, কয়েকদিনের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের
কারণে ক্রেতা কমে গেছে। অতিরিক্ত গরমে হাঁপিয়ে উঠেছে ব্যবসায়ীরা। জেনারেটর চালিয়ে লোকসান
গুনতে হচ্ছে অনেকের। যাদের বিকল্প হিসেবে আইপিএস রয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেটাও
ব্যবহার করতে পারছে না। আইপিএস এর ব্যাটারিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কাঞ্চন
এলাকার শাহেল মাহমুদ বলেন, ঘনঘন এবং অতিরিক্ত লোডশেডিং এর কারনে পানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
হাট বাজার থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে
পড়েছেন স্থানীয়রা। বেরিবাধ এলাকায় পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। ফলে জলবদ্ধতা থেকেই
যাচ্ছে।
উপজেলা
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আইভী ফেরদৌস বলেন, এই গরমে সকলকে বেশি
করে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে নানা ধরনের পানি বাহিত রোগের
আশঙ্কা রয়েছে। গরমে নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে। সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকদের পরামর্শ
নিতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ
পল্লী বিদ্যুৎ ২ এর জিএম প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, গত ৭ দিন আগে ভুলতা গ্রিড উপকেন্দ্রে
সকালে একবার এবং দুপুরে একবার ফ্লাশিং হওয়ার কারণে জি টি-১ এবং জি টি-২ দুইটি ট্রান্সফরমার
বন্ধ হয়ে যায়। ট্রান্সফরমার ২টি চালু করার কাজ করতে সময় লেগেছে। যার ফলে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার,
উপজেলায় এই সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ ছিলো। কাজটি খুবই জটিল বিধায় সমাধানে সময় লেগেছে।
তবে, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সমস্যা থাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। আশা করছি অতি দ্রুত
সময়ের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
রূপগঞ্জ
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে ভোগান্তি এবং
লোকসান হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের
সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।
আকাশজমিন/আরআর