আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালে জেন-জিদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগের পর দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। দেশটিতে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হলেও কোনও সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি জেন-জি প্রতিনিধিরা। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নেপাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জেন-জি আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, সেনাবাহিনী সঙ্কটকালীন আলোচনায় দেশটির বিতর্কিত চিকিৎসা উদ্যোক্তা দুর্গা প্রসাইকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দেশটির জেন-জি আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্ট পাউডেলকে কেবল বিবৃতিতে নয়, বরং রাজনৈতিক সমাধান খোঁজায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার দাবি জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে তারা আবারও বিক্ষোভ শুরু করবেন। এছাড়া দ্রুত এই সঙ্কটের অবসানে তাৎক্ষণিক সত্যাগ্রহ (অহিংস প্রতিরোধ) কর্মসূচির প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
নেপালের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং দুর্নীতি-বিরোধী কর্মী সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বের জন্য বেছে নিয়েছেন। অস্থায়ীভাবে দেশ ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন কার্কি।
দেশটির
সাবেক এই নারী প্রধান
বিচারপতির মনোনয়নে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। সুজিত কুমার ঝা নামের এক
আন্দোলনকারী ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘আমরা সুশীলা কার্কিকে
সৎ এবং নির্ভীক হিসেবে
দেখি। তিনি আমাদের সঠিক
পছন্দ। যখন সত্য কথা
বলে, তখন তা কার্কির
কণ্ঠস্বরের মতো শোনায়।
জুনাল গাদাল নামের আরেক বিক্ষোভকারী নেপালি গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের উচিত সুশীলা কার্কিকে বেছে নেওয়া; যিনি দেশের অভিভাবক হিসেবে সেরা বিকল্প। বিক্ষোভকারী ওজাস্বী বলেন, আমরা চাই সুশীলা কার্কি প্রধানমন্ত্রী হন; এমনকি যদি তা অস্থায়ী নিয়োগও হয়। আমাদের দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি সুন্দর হবে। আমরা তাকে বেছে নিতে চাই, কারণ তিনি আমাদের এই দেশ গড়তে সাহায্য করতে পারেন। এদিকে, কার্কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘‘এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে... তারা এখন অচল হয়ে গেছে।’’ জেন-জিদের একাংশ বিবৃতি দিয়ে প্রকৌশলী কুলমান ঘিসিংকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। দেশটিতে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে এই প্রকৌশলীর।
• কার্কি
ও সাংবিধানিক জটিলতা
নেপালের
সংবিধানের একটি ধারা আছে,
যা ২০১৫ সালে কার্যকর
হয়। নেপালের ২৩৯ বছরের পুরোনো
হিন্দু রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার সাত বছর পর
প্রণীত হয় ওই ধারা।
সংবিধানের এই ধারাকে কার্কির
অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে বাধা হিসেবে
দেখা হচ্ছে। তবে সূত্র বলছে,
সাংবিধানিক এই জটিলতা কাটিয়ে
ওঠার চেষ্টা চলছে।
দেশটির বেশিরভাগ আন্দোলনকারী কার্কির পক্ষে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি রাম চন্দ্র পাওডেলের বক্তব্যেও তার ইঙ্গিত মিলেছে। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি সংবিধানের মধ্যে থেকেই দেশের বর্তমান কঠিন পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি সব পক্ষকে আশ্বস্ত করছি... শিগগিরই সমাধান বের করার চেষ্টা চলছে; যাতে আন্দোলনরত নাগরিকদের দাবি পূরণ করা যায়।’’ এদিকে, বিক্ষোভকারীদের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেল। আর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন কার্কি।
ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে উঠে আসছে কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহর নাম। জেন-জি প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে ৩৫ বছর বয়সী এই প্রকৌশলীর। দেশটিতে র্যাপার-রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত তিনি। তবে শাহ দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালের দিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুশীলা কার্কির প্রতি সমর্থন জানান তিনি। বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘‘এখন আতঙ্কিত হবেন না, ধৈর্য্য ধরুন। দেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকার পেতে যাচ্ছে। এর কাজ হবে নির্বাচন আয়োজন করা; যা দেশে নতুন ম্যান্ডেট দেবে।’’
দেশটিতে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো এখনও পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে দেশটির সংবিধানে অস্থায়ী প্রশাসনের কোনও উল্লেখ না থাকায় এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। নেপালের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এমন দল (বা জোট) থেকে আসতে হবে; যার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এটি কার্কি বা ঘিসিংয়ের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। যদি কোনও বিকল্প না পাওয়া যায়, তাহলে প্রেসিডেন্ট নিজেই উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারেন কিংবা যে কোনও সংসদ সদস্য এগিয়ে এসে আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে পারেন। তিনি আস্থা ভোটে ব্যর্থ হলে সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে এবং দেশে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
• সংবিধান পরিবর্তন চাই না
কার্কি-সমর্থক জেন-জি আন্দোলনকারীরা
বলেছেন, সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা তাদের কোনও
লক্ষ্য নয়। অনিল বানিয়া
নামের এক আন্দোলনকারী নেতা
বলেন, ‘‘অনলাইন জরিপের মাধ্যমে আমরা সুশীলা কার্কিকে
ভোট দিয়েছি। আমরা সংবিধান পরিবর্তন
করতে চাই না... শুধু
প্রয়োজনীয় সংশোধনী চাই, যা কার্কিকে
অস্থায়ী শপথ নেওয়ার অনুমতি
দেবে।’’
অন্যদিকে, দেশটির রাজধানীতে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদেরও দেশজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার সকালের দিকে বিক্ষোভ শুরু করেন দেশটির হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। মঙ্গলবার সেই বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংস আকার ধারণ করে এবং প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য জন। দেশটিতে দুদিনের সহিংসতায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩১ জন নিহত ও ১ হাজার ৪০০ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন ও ঐতিহাসিক সিংহ দরবারে হামলা ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করেন।
আকাশজমিন
/আরআর