সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 471
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
চলনবিলে মাছ সংকট দেখা দেওয়ায় শুঁটকি পল্লীর চাতালগুলোতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। আগের মতো নেই থইথই পানি, আর পানির সঙ্গে সঙ্গে কমেছে দেশি মাছ। এর ফলে বিলুপ্তির পথে দেশের অন্যতম মিঠা পানির শুঁটকি। এই সংকটের কারণে শুঁটকি তৈরির জন্য স্থাপিত চাতালগুলোতে কাজ নেই বললেই চলে। ফলে ৫ শতাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
জানা গেছে, চলনবিল অঞ্চলে প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি জলাশয় ও ১৬টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে মাছ আহরণ করা হয়। এই জলাভূমি সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর—এই তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত। এখানকার মাছ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হয় ২৫টি দেশে।
হাটিকুমরুল-বনপাড়া হাইওয়ের পাশে মহিষলুটি এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল শুঁটকি চাতাল। চাটমোহরের বোয়ালমারি, সিংড়া বাজারসহ বিভিন্ন আড়ত থেকে মাছ কিনে এনে নারী-পুরুষ মিলে মিঠা পানির মাছ দিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি করেন শুঁটকি।
শুঁটকি চাতালের কাজ শুরু হয় ভোর থেকে—মাছে লবণ মাখানো, মাপজোখ, বহন করে মাচায় তোলা, নাড়া দেওয়া, বাছাই ইত্যাদি কাজ চলে সারাদিন। এখানকার শুঁটকি পৌঁছায় রাজধানীসহ সিলেট, সৈয়দপুর এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ ২৫টি দেশে।
তাড়াশ উপজেলার ঘরগ্রামের চাতাল মালিক আবু বক্কার জানান, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুঁটকি তৈরির মৌসুম। এ বছর মাছের সংকট থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ মণ শুঁটকি হচ্ছে, যেখানে আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৮০০ টন।
চাতাল শ্রমিক ছকিনা বেগম, আল্পনা খাতুন ও রোমেছা বেগম বলেন, আমরা কম মজুরি পেলেও মহাজনেরা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করায় খুশি ছিলাম। নারীরা ১৫০ টাকা, আর পুরুষ শ্রমিকেরা পান ৩০০ টাকা। কিন্তু মাছ সংকট থাকলে কাজ থাকবে না—তাহলে আমরা কোথায় যাব?
চাতাল মালিক আলতাব ও দেলবার হোসেন বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বাদাই জাল ও খরা মৌসুমে সেচ দিয়ে পোনা মাছ ধরে ফেলায় মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মাছ কমে যাচ্ছে, খরচ বেড়ে যাচ্ছে, ব্যবসায়ও লোকসান হচ্ছে।
মহিষলুটি মাছ আড়তের গোলাম কিবরিয়া বলেন, মাছ না থাকায় অনেক চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে, বাকিগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে। এতে অন্তত ৫ শতাধিক শ্রমিক বেকার হওয়ার মুখে।
তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোকারম হোসেন বলেন, বর্ষায় মা মাছ নিধন, কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলাশয় সংরক্ষণ না করায় মাছ কমে যাচ্ছে। চলতি বছর ১৪৩ মেট্রিক টনের জায়গায় ৩০-৪০ মেট্রিক টন কম উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আকাশজমিন /আরআর