সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 347
রেজাউল করিম ঝন্টু
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। দেশের সার্বিক উন্নয়ন কৃষির উপর নির্ভরশীল। কারণ দেশের প্রায় ৮০% মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের উপর জীবিকা নির্ভরশীল। এছাড়া ৯০% মানুষ পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বলা যায়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি কৃষি।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উর্বর শস্যক্ষেত্র ও মাছের উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। চলনবিল অঞ্চলের অধ্যশিত এই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শস্য ও ফলের চাষ হয়ে থাকে। সম্প্রতি এই অঞ্চলের সগুনা গ্রামের কৃষক মোঃ কামরুল ইসলাম মাল্টা চাষে নজির সৃষ্টি করেছেন।
কামরুল ইসলাম পুকুরের পাশের জমি ভরাট করে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ১ বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ শুরু করেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি ৭০ মণ মাল্টা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিমণ মাল্টার বাজার মূল্য ছিল ২,৬০০/- টাকা। তিনি জানান, প্রতি বিঘা মাল্টা চাষে সর্বাধিক ৩৫,০০০/- টাকা খরচ হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১০০ মণ মাল্টা উৎপাদনের আশা করছেন।
কৃষকের কথায়, “এক গাছে সর্বাধিক তিন মণ মাল্টা ধরে। প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় মাল্টা ধরে যা দেখলে চোখ জুড়ি যায়। এ বাগান থেকে লাভবান হওয়ায় এলাকার অন্যান্য চাষিরাও মাল্টা চাষে উৎসাহী হয়ে উঠছেন।”
সিরাজগঞ্জে মাল্টা চাষের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অন্যান্য ফসলের দাম কমে যাওয়ায় এবং চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা নতুন এবং লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। দ্বিতীয়ত, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাল্টার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি এবং ভালো দাম পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটি মাল্টা চাষের জন্য উপযুক্ত এবং গাছ প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহিষ্ণু।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, মাল্টা চাষের ফলে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এলাকায় শতাধিক মাল্টার বাগান গড়ে উঠেছে। এ কর্মের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০০ বেকার যুবক ও যুবতী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। মাল্টা মানবদেহের ক্ষতিকারক কোন কেমিক্যাল ছাড়াই বাজারজাত করা হয়, যা স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ।
মাল্টা চাষের নিয়মাবলী সম্পর্কে কৃষকরা জানিয়েছেন, চারা রোপণ থেকে ১৮ মাস পর ফলন শুরু হয়। বছরে দুইবার ফল পাওয়া যায়। বিদেশী আমদানিকৃত ১ কেজি মাল্টার দাম ৩২০/- টাকা, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদিত মাল্টার দাম মাত্র ৬৫/- টাকা। ফলে প্রান্তিক চাষিরাও স্থানীয় মাল্টা সহজে ক্রয় করতে পারেন।
তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শমিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, মাল্টা চাষিদের সহযোগিতা করার জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে চাষিরা তাদের ফল নির্বিঘ্নে বাজারজাত করতে পারেন। দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে ভালো জাতের মাল্টা চারা রোপণ করলে ফলন ভালো হয়। যারা মাল্টা চাষে আগ্রহী তাদেরকে কৃষি অফিসের তরফ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, “মাল্টা চাষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, এটি স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি করছে। নতুন জাতের ফল ও ফসল চাষে কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, “প্রতিটি গাছের মাল্টা মান বজায় রাখতে সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত পানি ও সার ব্যবহার করা প্রয়োজন। এতে করে গাছের স্বাস্থ্য ভাল থাকে এবং ফলনও বৃদ্ধি পায়।”
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, বিদেশি আমের দাম অত্যধিক হওয়ায় সাধারণ মানুষ ক্রয় করতে পারছে না। তাই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাল্টার চাহিদা বেশি। কামরুল ইসলামের উদাহরণ দেখিয়ে নতুন চাষিরাও মাল্টা চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
এলাকার বাজারে মাল্টা বিক্রির সুবিধা সহজ করার জন্য তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিস বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে করে চাষিরা সরাসরি বাজারজাত করতে পারছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাল্টা চাষের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব। এলাকার পরিবেশ ও আবহাওয়া মাল্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
তাড়াশ উপজেলার স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের প্রশিক্ষণ এবং চারা সরবরাহ করে মাল্টা চাষকে আরও সহজ ও লাভজনক করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর ফলে চাষিরা নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাল্টা চাষে সরকারি সহায়তা থাকায় এলাকার যুবকরা কৃষিতে আরও আগ্রহী হচ্ছেন। এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং বেকারত্ব হ্রাস করছে।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে কৃষক কামরুল ইসলামের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষি সম্প্রদায়ের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে লাভজনক ফলন অর্জন সম্ভব।
আকাশজমিন / আরআর