সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 258
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কাটাগাঙে অবৈধ সোঁতিজাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে পানি নিষ্কাশনে ধীর গতি দেখা দিয়েছে। এতে চলনবিল অঞ্চলে সরিষাসহ রবিশস্যের আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, দ্রুত পানি না নামলে তাদের মৌসুমি চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ প্রশাসন এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
তাড়াশ উপজেলা দেশের অন্যতম জলাভূমি চলনবিল অধ্যুষিত এলাকা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এটি দীর্ঘদিন ধরে শস্য ও মৎস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। অক্টোবরের শেষদিকে চলনবিলের পানি সাধারণত কাটাগাঙ দিয়ে নামতে শুরু করে। কিন্তু এ বছর উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইল এলাকা থেকে শুরু করে মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ব্রিজ পর্যন্ত অন্তত ছয়টি স্থানে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র অবৈধ সোঁতিজাল বসিয়ে মাছ ধরছে। ফলে কাটাগাঙের পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, পানির ধীর নিষ্কাশনের কারণে জমিতে সরিষা বপন দেরি হচ্ছে। চলনবিল এলাকায় রবিশস্য মৌসুমে সরিষা চাষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। প্রতি বছর এখানকার কৃষকরা বোরো ধানের আগে অতিরিক্ত আয় করতে সরিষা আবাদ করেন। কিন্তু এবার অবৈধ সোঁতিজালই হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই চলনবিল এলাকায়। পানি দ্রুত না নামলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।
সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, কুন্দইল ব্রিজের দক্ষিণ পাশে কাটাগাঙে অবৈধ সোঁতিজাল বসিয়ে মাছ শিকার করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী বুরজু সরদারের ছেলে সোহেল রানা, মোক্তার হোসেনের ছেলে কামরুল হাসান, আরজু রহমানের ছেলে আরিফ আহমেদ, দিদার আলীর ছেলে রিপন হোসেন এবং ইউনুস আলীর ছেলে জমির উদ্দিন।
তারা সংঘবদ্ধভাবে বাঁশের চাটা, খোলপা ও মিহি কারেন্টজাল ব্যবহার করে পানির প্রবাহ রোধ করে বিশাল আকৃতির সোঁতিজাল পেতেছে। ফলে শুধু মাছ নয়, নানা প্রজাতির জলজ প্রাণীও নির্বিচারে মারা পড়ছে। এর ফলে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাটাগাঙের উভয় পাশে প্রকাশ্যেই এসব জাল বসিয়ে মাছ ধরা হলেও প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তারা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের নীরবতা কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর এভাবে অবৈধ মাছ শিকার চালিয়ে যাচ্ছে।
তাড়াশের কৃষকরা বলছেন, “যদি দ্রুত এসব সোঁতিজাল অপসারণ না করা হয়, তাহলে আমরা সরিষা বপন করতে পারব না। আমাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে।”
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “চলনবিলের পানি নামার সময় অনেকেই অবৈধ জাল বসিয়ে মাছ ধরে, এতে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আমরা মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এসব সোঁতিজাল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেব।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবৈধ সোঁতিজালের কারণে চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পুরো বিলের পরিবেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ না হলে শুধু কৃষক নয়, পুরো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যই ধ্বংসের মুখে পড়বে।
চলনবিলের মানুষের দাবি, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অবৈধ সোঁতিজাল অপসারণ করবেন, যাতে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হয়ে কৃষকেরা আবারও রবিশস্যের আবাদে ফিরতে পারেন।
আকাশজমিন / আরআর