ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের

ধ্বংসের পথে ঐতিহাসিক হেমনগর জমিদার বাড়ি


টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক হেমনগর জমিদার বাড়ি

  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ সময় : ৭:৪৮ পিএম

মোজাম্মেল হক, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার শিমলাপাড়া মৌজায় অবস্থিত হেমনগর জমিদার বাড়ি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়ভাবে “পরীর দালান” নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদ একসময় ছিল জমিদারি ঐশ্বর্য, সংস্কৃতি, ও শিল্পরুচির অনন্য প্রতীক। বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। তবুও এর দেয়াল, কারুকাজ, এবং ভাস্কর্য এখনো দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ব্যবসায়ী কালীচন্দ্র চৌধুরী সূর্যাস্ত আইনের আওতায় শিমুলা পরগনার জমিদারি ক্রয় করেন। তিনি মূলত ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর থানার আম্বারিয়া এ্যাস্টেটের জমিদার ছিলেন। পরবর্তীতে তার পুত্র হেমচন্দ্র চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব পান। কিন্তু আম্বারিয়া থেকে বিশাল শিমুলা পরগনা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়লে তিনি ১৮৮০ সালে মধুপুরের রাজবাড়ি ত্যাগ করে গোপালপুর উপজেলার সুবর্ণখালি নদীবন্দরের কাছাকাছি নতুন রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন।

তবে যমুনা নদীর ভাঙনে সুবর্ণখালি বন্দরের বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেমচন্দ্রের রাজপ্রাসাদও ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৮৯০ সালে তিনি শিমলাপাড়া মৌজায় নতুন করে এক বিশাল রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন—যা পরবর্তীতে “হেমনগর জমিদার বাড়ি” নামে পরিচিতি লাভ করে।

বাড়িটি স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৬০ একর জমির উপর বিস্তৃত এই প্রাসাদটি শতাধিক কক্ষবিশিষ্ট, যার মূল অংশ তিন একর জায়গাজুড়ে। সামনে ও পিছনে রয়েছে দুটি পুকুর, নাট্যমঞ্চ, পূজামণ্ডপ, হাতিশালা, চিড়িয়াখানা, ফুলের বাগান ও বিশাল ঘাট।
দালানের ছাদে দুটি বিশ্রামরত পরীর ভাস্কর্য—যা থেকে “পরীর দালান” নামটির উৎপত্তি। বাড়িটির দেয়াল ও পিলারে রঙিন কাঁচের মাধ্যমে ফুল, তারা ও গাছের নকশা করা হয়েছে। দিল্লি ও কলকাতার কারিগররা ইট, চুন, সুরকি ও পাথরের অপূর্ব সমন্বয়ে নির্মাণ করেন এই রাজপ্রাসাদ। ছাদের কারুকাজে ব্যবহার করা হয় হল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত কড়িপাথর।

প্রাসাদের ভেতর ছিল রাজ পরিবারের নাট্যমঞ্চ, যেখানে কলকাতা থেকে শিল্পীরা এসে নাটক ও যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করতেন। এমনকি রাতে আলোর জন্য জেনারেটর ব্যবহার করা হতো—যা সে সময়ের গ্রামীণ বাংলায় ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাড়ির ভেতরে একাধিক কূপ খনন করা হয়েছিল সুপেয় পানির জন্য।

জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন সমাজে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারদের অত্যাচার বাড়লে কৃষক সমাজ বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। ১৯৪০ সালের দিকে কৃষক নেতা হাতেম আলী খানের নেতৃত্বে প্রজা বিদ্রোহ শুরু হয়, যা দমন করতে ব্যর্থ হয়ে জমিদার পরিবার দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়।
১৯৪৬ সালে তারা সমস্ত সম্পদ ফেলে কলকাতায় চলে যান। সেই সঙ্গে জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটে। হেমচন্দ্র চৌধুরী ১৯৫২ সালে ভারতের কাশিতে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে হেমনগর জমিদার বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭৯ সালে এলাকাবাসীর উদ্যোগে জমিদার বাড়ির একটি অংশে প্রতিষ্ঠিত হয় হেমনগর ডিগ্রি কলেজ। তবুও মূল প্রাসাদটি আজও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

দালানের ভেতরের সিঁড়ি ভাঙা, কারুকাজ মলিন, দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, অনেক স্থানে ছাদ ধসে পড়েছে। তবুও এর স্থাপত্য ও শিল্পরুচির ঐতিহ্য আজও ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের কাছে এক বিস্ময়। স্থানীয় ইতিহাসবিদরা বলছেন, “হেমনগর জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলার জমিদার যুগের সংস্কৃতি, শিল্প, অর্থনৈতিক শক্তি ও সমাজব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।”

এলাকাবাসীর দাবি, “এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে, একদিকে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে, অন্যদিকে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।”

গোপালপুর উপজেলার স্থানীয় শিক্ষক মো. নূরুল আমিন বলেন, “প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন। কিন্তু কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাই।”

এলাকার তরুণরা বলেন, “যদি হেমনগর জমিদার বাড়ি সংরক্ষিত পর্যটন স্থানে রূপ নেয়, তাহলে আমাদের এলাকার বেকার তরুণদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।”

অন্যদিকে টাঙ্গাইলের ইতিহাস গবেষক সাইফুল্লাহ রুমান বলেন, “এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা নষ্ট হতে দেওয়া মানে আমাদের সংস্কৃতির অবমাননা। সরকার ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি একযোগে উদ্যোগ নেয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র।”

হেমনগর জমিদার বাড়ি তাই শুধু একটি পুরোনো রাজপ্রাসাদ নয়, এটি টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্পরুচির এক অমূল্য সম্পদ। সঠিক সংরক্ষণ পেলে এটি হতে পারে “বাংলার রাজবাড়ির রানি”—যা বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করবে, বহুকালের গল্প বলবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর