বাংলাদেশে শিশু অধিকার ও সুরক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে “শিশু অধিকার পরিস্থিতি উপস্থাপন শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠান” অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে লাল সবুজ সোসাইটি এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (MJF)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিতান কুমার মণ্ডল। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন জেলা পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালক আকিব উদ্দিন, জেলা পরিসংখ্যান উপপরিচালক আইয়ুব হোসেন, রূপান্তর (এনজিও) নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ ও প্রজেক্ট অফিসার সাকি রেজওয়ানা। এছাড়া পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সংস্থা, সাংবাদিক, গবেষক, তরুণ সমাজকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় লাল সবুজ সোসাইটির প্রতিনিধি আহসান সাকিব শিশু অধিকার পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন। জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত দেশের ১২টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত শিশু বিষয়ক সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিশু সুরক্ষার সবচেয়ে বড় হুমকি হলো অনিরাপদ পরিবেশ, সহিংসতা ও শোষণ, যা মোট ঘটনার ২৫%-এরও বেশি।
মোট ১,২৮৯টি সংবাদ বিশ্লেষণের মধ্যে ১,০৬৯টি নেতিবাচক এবং ২২০টি ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান তিনটি ঝুঁকি হলো: শিশু ধর্ষণ ও হত্যা – ৩৭.৬১% (৪০২ জন), দুর্ঘটনায় মৃত্যু – ১৫.৯৬%, স্বাস্থ্য বৈষম্য ও নিপীড়ন – ৪৬.৪৩%। ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক সংখ্যক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা নগর-গ্রামের বৈষম্য স্পষ্টভাবে দেখায়।
শিশু সুরক্ষা বিষয়ক ইতিবাচক সংবাদ ২২০টি, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ (১০.৯%) সংক্রান্ত। জনকণ্ঠ পত্রিকা শিশু সুরক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো: শিশু নির্যাতন ও দুর্ঘটনা বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। মিডিয়া সচেতনতা বাড়লেও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের ঘাটতি এখনও প্রকট।
প্রধান অতিথি বিতান কুমার মণ্ডল বলেন, “শিশুদের নিরাপত্তা দয়ার বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার। অরক্ষিত শৈশব সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
উক্ত অনুষ্ঠানে অতিথিরা আরও বলেন, শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং স্বাস্থ্যখাতের আন্তঃসম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব।
সেফ প্রজেক্টের প্রজেক্ট অফিসার তানভীর হাসান অনন জানান, খুলনার কয়রা উপজেলার নয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সেখানে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশু শ্রম এবং পরিবারের সাথে সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। এছাড়া স্কুলগুলোতে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন ও শিশু মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে নেতিবাচক ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় তথ্য অনুপস্থিত, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। সুপারিশ করা হয়েছে, শিশু সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবায় সমতা নিশ্চিত করা, মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা উৎসাহিত করা এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করা।
আকাশজমিন / আরআর