ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসের হকারদের সংগ্রামী জীবন


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৮ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৭:৩৪ পিএম

মোজাম্মেল হক, টাঙ্গাইল

“হেলপারের ধাক্কায় রানিং গাড়ীতয় পড়ে হাত, পা কাইটা গেছে, গাড়ীর চাকার নিচে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো, কোনমুতে বাঁইচা গেছি।” — কথাটি বলছিলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মোতালেব, যিনি চলন্ত বাসগাড়ীর চলন্ত হকার। বাসে উঠে যাত্রীদের মাঝে বাদাম, ডালভাজা, চানাচুর, আচার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। ৫০ বছর বয়সী মোতালেব গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে যাত্রাপথে নানা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। গৃহিণী স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে দারিদ্রতা সঙ্গী করেই দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, “দিন আনি, দিনেই খরচ করি, এভাবেই চলছে নিরামিষ জীবনযাপন।”

চলন্ত বাসের হকারদের জীবন সংগ্রামী ও ঝুঁকিপূর্ণ। রোদ-বাদল কিংবা যানজটের মধ্যেও তারা বিভিন্ন ছোটখাটো পণ্য যেমন চিপস, বাদাম, চানাচুর, হাতপাখা, ঔষধ, মাস্ক, টুথব্রাশ, আম, পেয়ারা, শশা ইত্যাদি বিক্রি করেন। যাত্রীদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে তাদের প্রচেষ্টা ও ধৈর্য্যও প্রয়োজন। বাসে ওঠা-নামার সময় দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকে শুরু করে যাত্রীদের নেতিবাচক মনোভাবও তাদের কাজ কঠিন করে তোলে। তবে যাত্রীরা যখন সুন্দর ব্যবহার করেন, তখন তাদের পণ্য বিক্রি সহজ হয়।


টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে যমুনা সেতুর গোলচত্তর পর্যন্ত চলন্ত হকাররা নিয়মিত বাস ও লোকাল পরিবহনে উঠে পণ্য বিক্রি করেন। সাধারণত দাম থাকে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। পণ্য বিক্রি করার জন্য তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা থাকতে হয়। হকারদের প্রায় সবাই প্রতিদিন ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকার পণ্য বিক্রি করলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হয়। তাদের দিন শুরু হয় সকাল ১০ টার পর থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

৪২ বছর বয়সী মনি চন্দ্র চাকী মির্জাপুরের আন্দারা গ্রামের বাসিন্দা। ২০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন তিনি। ছোট্ট সংসারে অভাব জয় করে চলেছেন। তার বাবা জমি বিক্রি করে সাতজন পিসিকে বিয়ে দিয়েছেন। মনি বলেন, “গাড়ীতে উঠে বাদাম, চানাচুর, শশা বিক্রি করি। দূরপথের যাত্রীরা আমাদের কাছ থেকে সস্তায় পণ্য কিনে ক্ষুধা নিবারণ করেন। অন্য পেশায় যাওয়ার চিন্তা করিনি, অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করে সংসার চালানো যাচ্ছে, তাতেই খুশি।”

কালিহাতীর গোয়ালিয়াবাড়ীর ৪৫ বছর বয়সী আশরাফ আলী কাপড় ব্যবসার লোকসানের পর হকার পেশায় নামেন। তিনি চোখের সমস্যায় ভুগলেও সংসারের জন্য হকার পেশা ছাড়তে পারেননি। আশরাফ বলেন, “গাড়ীতে ওঠার সময় হেলপাররা ভালো চোখে দেখে না, জোর করে উঠি। নানা সমস্যা হয়, তবু আল্লাহ চালালে ভালো চলে।”

টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা এলাকার বাদশা মিয়া যানবাহন থেকে ঘুরে ঘুরে শশা ও আম বিক্রি করেন। দুই ছেলে নিয়ে ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালান। উল্লাপাড়ার রফিকুল ইসলাম ও কবির হোসেন ইমিটেশন গয়না ও ব্রেসলেট বিক্রি করে মাসে প্রায় ২৫০০ টাকা আয় করেন, যার ৭০০-৮০০ টাকা লাভ হয়। সিরাজগঞ্জের কবির মিয়া ১৮ বছর ধরে হকার পেশায় রয়েছেন। তাঁর বাবা দরিদ্র কৃষক ছিলেন, ছোটবেলা থেকেই সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন।

মির্জাপুরের মানিক পাল গাড়ী চালকদের হকারদের প্রতি সহনশীলতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। উত্তরবঙ্গের চালক সেলিম বলেন, “চলন্ত হকাররা ক্ষুধার্ত যাত্রীদের জন্য সর্বক্ষণ সেবা দেয়, লং জার্নির ক্ষুধা নিবারণ তারা করে।”

দেলদুয়ারের ৩০ বছর বয়সী রুবেল বলেন, “গাড়িওয়ালা গাড়ীতে উঠতে দেয় না, তবু জোর করে উঠি। গরীব মানুষ, পেট ভাতের তাগিদে কাজ করি। দুই মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে চলছি, দোয়া করবেন।” গালা ইউনিয়নের আব্দুর রহিম বলেন, “আমরা গরীব মানুষ, গাড়ীতে উঠতে গেলে ধাক্কা দিয়ে সরায় দেয়, সেটা খুব কষ্ট দেয়। আমরা কিছু কইড়া খাই।”

চলন্ত হকারদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত হলেও আর্থিক অভাবের কারণে এই পেশায় বাধ্য হয়ে থাকেন। সমাজে সম্মানের অভাব ও মানসিক যন্ত্রণায় তারা ভুগেন। তারা চান, এই পেশাকে হেয় না করে সমাজে সম্মান ও মূল্যায়ন করা হোক। কারণ, “আমরাও মানুষ, আমরা কাজ করে খেতে চাই।”

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর