ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ভেনেজুয়েলা সংকট: নিকোলা মাদুরো টিকতে পারবেন কি?


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৩:৪৩ পিএম

কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার নাম বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠছে প্রায় প্রতিদিন। ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌ মহড়া, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি, নিকোলা মাদুরোর ‘যুদ্ধপ্রস্তুতি’—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, দেশটা যেন একটা ‘টাইম বোমা’র ওপর বসে আছে।

এই সময়ে ভেনেজুয়েলা শুধু একটি দেশ নয়; যেন পুরো লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যতের আয়না। এখানে যা ঘটবে, তার ছায়া পড়বে কিউবা, নিকারাগুয়া এবং বলিভিয়া পর্যন্ত। অনেকের প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কী হবে? মাদুরো কি সত্যিই পড়ে যাবেন, নাকি টিকে যাবেন?

ভেনেজুয়েলায় সাধারণ মানুষের কষ্ট কমছে না। দেশটিতে এখনো তীব্র মূল্যস্ফীতি চলছে। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ২৫০–৩০০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। টানা সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও পেশাজীবীরা। একজন সরকারি স্কুলশিক্ষকের মাসিক বেতন মাত্র ১০–১২ ডলার, যা দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজনও মেটানো কঠিন। ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটির লোকসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি।

হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন নিকোলা মাদুরো। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশটিতে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। বিরোধীরা দাবি করেছেন, নির্বাচনে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেস বিপুল ভোটে জিতেছেন। তবে মাদুরো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। এর পর থেকে দেশে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। এখনো ১ হাজার ৮০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দী কারাগারে রয়েছেন।

গত অক্টোবরে মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। পশ্চিমা দেশগুলো এটিকে গণতন্ত্রের জয় হিসেবে দেখছে। মাদুরো বলছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের পুরস্কার।

মাদুরোর রাজনৈতিক যাত্রায় চাভেজের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। ১৯৯২ সালে চাভেজ সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর কারাগারে যান। সেই সময়ে মাদুরো ছিলেন একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, যিনি চাভেজের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। চাভেজ ১৯৯৮ সালে নির্বাচনে জেতার পর ধীরে ধীরে মাদুরোকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে আসেন। ২০০৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০১২ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। চাভেজের শেষ বছরগুলোতে মাদুরো তাঁর পাশে ছিলেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কিউবায় অস্ত্রোপচারের আগে চাভেজ টিভিতে বলেছিলেন, “যদি আমার কিছু হয়, তোমরা নিকোলা মাদুরোকে ভোট দিয়ো। সে বিপ্লবের সত্যিকারের সন্তান।”

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক তলোয়ার ‘সোর্ড অব পেরু’ উঁচিয়ে ধরেন মাদুরো। এটি লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা সিমন বলিভারের ২০০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয়। তবে ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় চাভেজ ও মাদুরোর মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। চাভেজের নাম শুনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় ছুটে আসতেন, মাদুরো তেমন নয়। মাদুরোকে স্বীকৃতি দেয় মূলত রাশিয়া, ইরান ও চীন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লাতিন আমেরিকা নিয়ে নীতি আরও কঠোর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্য লাতিন আমেরিকায় চাপ প্রয়োগ করছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, মাদক পাচার রোধ এবং চীনের প্রভাব কমানো মূল লক্ষ্য। মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ এবং ক্যারিবীয় সাগরে নৌ মহড়া মাদুরো সরকারকে চাপে রাখতে সামরিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই নীতির ফলে সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রমুখী অভিবাসনপ্রবাহ কমেছে। নতুন নিরাপত্তা ও বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে। তবে শুল্ক, কূটনৈতিক চাপ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং অর্থনীতি চাপে পড়েছে।

এক্ষেত্রে মাদুরোর রাজনৈতিক শক্তি তিনটি ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে—সামরিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক বন্ধুমহল এবং ভয়-ভিত্তিক সমর্থকগোষ্ঠী। সেনাবাহিনী মাদুরোর পাশে দৃঢ়। তারা সোনার খনি, তেল পাচার, জ্বালানি সরবরাহ ও সীমান্তে অবৈধ অর্থচক্র নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই নেটওয়ার্ক থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ ডলার আয় হয়।

মাদুরোর আন্তর্জাতিক সমর্থন ছোট হলেও কার্যকর। রাশিয়ার সামরিক উপদেষ্টা, ইরান ভেনেজুয়েলাকে ড্রোন, প্রযুক্তি ও পরিশোধনাগারে সহায়তা দিচ্ছে। চীন নিয়মিত ঋণ দিচ্ছে এবং কিউবা গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক ধস, ২৭০ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও ২০–২৫ শতাংশ নাগরিক মাদুরোকে সমর্থন করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেন—যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে দেশ লিবিয়া বা ইরাকের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়বে। সরকারি প্রচারে বলা হয়, ‘ইয়াঙ্কিরা এলে দেশ ধ্বংস হবে, পরিবার বিপদে পড়বে।’

ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থানও মাদুরোর টিকে থাকার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সময় দিচ্ছেন, গণতান্ত্রিক সমাধান চান। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করেছেন। মেক্সিকো মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

বিরোধীদের মধ্যে অনৈক্য এখনও বড় সমস্যা। মাদুরোর সেনাবাহিনী ও বিদেশি সমর্থনের কারণে কার্যকর চাপ তৈরি করা যাচ্ছে না। তাই মাদুরোর ক্ষমতা ধরে রাখা বা পতনের মধ্যে যে কোনো সম্ভাবনা ভেনেজুয়েলার জন্য অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর