পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে—এটা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, গরম কি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে মানুষ বাঁচতেই পারবে না? বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার ঘটনা নিয়মিত হলেও অধিকাংশ বাসযোগ্য অঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো মানুষের সহনীয় সীমার মধ্যে আছে। শুষ্ক গরমের জায়গায় মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠাণ্ডা রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় এমন অঞ্চলে, যেখানে প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে আর্দ্রতাও বেশি থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের উপকূলীয় অঞ্চল, পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চল এবং ভারতের উপমহাদেশের কিছু এলাকায় সামুদ্রিক আর্দ্রতা যুক্ত হয়ে তাপমাত্রাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। সেখানে ঘাম দ্রুত বাষ্পীভূত না হওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে দীর্ঘসময় অবস্থান করলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঝুঁকি মাপতে ব্যবহার করেন ‘ওয়েট বাল্ব থার্মোমিটার’। এই সূচক যদি ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তা মানুষের জন্য মারাত্মক। কারণ তখন শরীর আর তাপ বের করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের মে মাসে দিল্লির তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যার ফলে অসংখ্য মানুষ তাপদাহে প্রাণ হারান। এর পেছনে মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
যখন আমরা কয়লা, তেল বা গ্যাস জ্বালাই, তখন বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড জমা হয়। এই গ্যাস সূর্যের তাপ আটকে রেখে পৃথিবীকে আরও উষ্ণ করে তোলে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে গরম ও আর্দ্রতার ঝুঁকি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গালফ কোস্ট, মরুভূমি অঞ্চল এবং কৃষিতে জল স্প্রের ব্যবহারকৃত এলাকা—সব জায়গাতেই এখন ঝুঁকি বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু গরমেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে অগ্নিকাণ্ড, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং ভয়াবহ বন্যার মতো বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, একুশ শতকের শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে প্রায় ২০ কোটি মানুষ বাসস্থান হারাতে পারেন। কৃষি উৎপাদন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং স্বাস্থ্য সংকট আরও তীব্র হবে।
খারাপ খবর হলো—যতদিন আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াব, তাপমাত্রা বাড়তেই থাকবে। কিন্তু আশার খবরও আছে—বিশ্ব দ্রুত পরিষ্কার জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। গত ১৫ বছরে সোলার ও উইন্ড পাওয়ারের খরচ ব্যাপকভাবে কমেছে এবং এগুলো এখন আরও নির্ভরযোগ্য। প্রায় সব দেশ জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, বন সংরক্ষণ এবং টেকসই জীবনধারা গ্রহণ করলে পৃথিবীকে এখনো বাসযোগ্য রাখা সম্ভব।
আকাশজমিন / আরআর