নড়াইলে সরিষা ফুলের হলুদ রঙে রঙ্গিন হয়ে উঠেছে ফসলের মাঠ। নড়াইল সদর উপজেলার গোবরা সড়কে যেতেই চোখে পড়ে কাড়ার বিলের বিস্তীর্ন ফসলের মাঠ, যা হলুদের সমারোহে ভরে গেছে। শীতের সোনাঝরা রোদে সরিষার খেত যেন চিকচিক করছে, আর ফুলে ভরা গাছের মাঝে মৌমাছির গুনগুনানি চারপাশকে প্রাণবন্ত করেছে। হালকা বাতাসে সরিষার গাছ দুলছে, আর ফুলে ফাঁকে ফাঁকে ফলের পরিপাকের আভাস দেখা যাচ্ছে, যা দেখে কৃষকের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৩,৪৮৭ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এর থেকে ১৯,২৮৬ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণত আমন ধান কাটার পর এই জমি পরিত্যক্ত থাকে। কৃষকরা অতিরিক্ত ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করে লাভের আশায়।
ধোপাখোলা গ্রামের সরিষা চাষি নিপেন কার্তিক রায় বলেন, “২ একর জমিতে চলতি মৌসুমে রিলে পদ্ধতিতে সরিষা চাষ করেছি। ফুলে ফুলে ভরে গেছে খেত। গাছে পরিপক্ব হয়েছে সরিষা। এখন খেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছি।” নুনখির গ্রামের কৃষক সুজিত বলেন, “কৃষি অফিসের পরামর্শে আমন ধানের সাথে রিলে পদ্ধতিতে সরিষা চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে ভালো ফলন আশা করছি।”
মুশুড়িয়া গ্রামের সরিষা চাষি রিন্টু বিশ্বাস জানান, “১ একর জমিতে এ বছর সরিষা চাষ করেছি। ফুল দেখে মনে হচ্ছে ফলন ভালো হবে। আশা করছি বাড়ির তেলের চাহিদা পূরণ করতে পারব এবং বাজারে সরিষা বিক্রি করে কিছু আয় হবে।”
গোবরা কাকড়ার বিলের সরিষা ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য এবং মৌমাছির গুনগুনানি দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন হলুদ বর্ণে সেজে ওঠা সরিষা খেতের ছবি। সরিষার খেত বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছেন একদল তরুণ। তাদের মধ্যে কৃপা বিশ্বাস বলেন, “রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, মাঠ ভরা সরিষা ফুল দেখে ভিডিও করতে আসলাম। বন্ধুদের সঙ্গে সরিষা বাগান দেখতে এসে বেশ আনন্দ লাগছে।”
নড়াইল সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, “রিলে পদ্ধতিতে সরিষা চাষের জন্য কৃষি অফিস থেকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে পূর্বে দুই ফসল হতো, সেখানে এখন রিলে পদ্ধতিতে আমন ধানের সঙ্গে সরিষা চাষ করে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।”
রিলে পদ্ধতি বলতে বোঝানো হচ্ছে, একই জমিতে একসঙ্গে দুই বা ততোধিক ফসলের চাষ, যা জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। নড়াইলের কৃষকরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ধান কাটা শেষে সরিষা চাষ করে অতিরিক্ত আয় করছেন। এছাড়া স্থানীয় কৃষি অফিস নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে কৃষকদের মাঠ পরিচালনায় সহায়তা করছে।
সরিষা ফুলের মাঠ কেবল কৃষকদের জন্য লাভের উৎস নয়, বরং এটি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্যও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। গরম রোদ এবং ফুলের উজ্জ্বল হলুদ রঙে পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বহু মানুষ বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে আসেন, সরিষার খেতের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং ছবিও তুলেন।
কৃষকরা বলেন, সরিষার চাষ আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ির তেলের চাহিদা মেটাতে সহায়ক। ধোপাখোলা, মুশুড়িয়া ও নুনখির গ্রামের কৃষকরা রিলে পদ্ধতি ব্যবহার করে জমির সর্বাধিক উৎপাদন পাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষি অফিস জানিয়েছে, এই পদ্ধতি নড়াইলের কৃষকদের জন্য খুবই কার্যকর এবং এতে তারা আর্থিকভাবে সুরক্ষিত হচ্ছেন।
সরিষা খেতের সৌন্দর্য এবং ফুলের পোকামাকড়ের উপস্থিতি স্থানীয়দের জন্য এক প্রাকৃতিক দৃশ্যের আনন্দ দিচ্ছে। শীতের রোদে হালকা বাতাসে দুলতে থাকা সরিষার ফুল প্রকৃতিকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যটক ও দর্শনার্থীরা প্রতিনিয়ত খেতে ভ্রমণ করছেন।
এভাবে নড়াইলের সরিষা খেত স্থানীয় কৃষক ও পর্যটকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কৃষকরা আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এ মৌসুমে তারা ভালো ফলন পাবে এবং বাজারজাতকরণ ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।
ঢাকা টুডে / আরজে