জহুরুল হক বুলবুল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি আঙিনা। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে মুখরিত হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাঙ্গাইল জেলার প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পদচারনায়। দূরের অনেকেই আগের দিন সপরিবারে এসে উঠেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে।
সকাল ১০ টায় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহা. ফরিদ উদ্দীন খান। বর্ণাঢ্য র্যালি ও নাস্তার পর শুরু হয় আলোচনা অনুষ্ঠান। টাঙ্গাইল জেলা সমিতি (টাজেস)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. পাপিয়া সুলতানার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেনÑটাজেস-এর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল হক, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মনজুরুল আলম, অধ্যক্ষ মো. লুৎফর রহমান, বিশিষ্ট শিল্পপতি আতিকুর রহমান আতিক, অধ্যাপক এসএম শামীম আল মামুন, সম্পাদক ওবায়দুল সিকদার প্রমূখ। আলোচনা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন জাকিয়া ইসলাম রোজা।
মধ্যাহ্ন ভোজের পর ছিল স্মৃতিচারণ। ড. মোহাম্মদ জুলফিকার আলীর উপস্থাপনায় একের পর এক স্মৃতিচারণ করেন সবাই। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকের কন্ঠ বাষ্পস্তব্ধ হয়ে যায়, ভিজে যায় চোখের পাতা। সন্ধ্যায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অধ্যাপক ড. পদ্মিনী দে-এর নির্দেশনায় সংগীত সন্ধ্যায় গান, নৃত্য ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশিত হয়। র্যাফেল ড্র-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজনের ফাঁকে স্মৃতি বিজরিত আবাসিক হলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কয়েকটি কক্ষ দেখে মনে হলো, কে কোন বিভাগের ছাত্র তা বোঝা খুবই দুরূহ। প্রায় সবার টেবিলে একই ধরনের বইÑবিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক গাইড। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম বেশি একই চিত্র। গিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতেওÑহঠাৎ করে এতো পাঠক দেখে যেকোনো ব্যক্তি মুগ্ধ হবেন। ভালো করে দেখলেÑলাইব্রেরির ভেতরে অধিকাংশ পাঠকই চাকরি প্রত্যাশী পাঠক। সবাই ব্যস্ত চাকরির প্রস্তুতিমূলক বই নিয়ে। এরা মৌলিক বইয়ের পাঠক নন। এ রা হলেন নোট-গাইডের পাঠক। দেশি-বিদেশি বইয়ের সম্ভারে সমৃদ্ধ বিশাল লাইব্রেরি। কত কর্মকর্তা-কর্মচারী সেবায় নিয়োজিত। কিন্তু লাইব্রেরি কীভাবে চলে যাচ্ছে নোট-গাইড পাঠকদের দখলে!
কলা ভবনের সামনে উন্মুক্ত স্থানে বসে ছাত্র-ছাত্রীরা ধূমপান করছে। খেলছে তাস। পাশ দিয়েই যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো স্যার বা সিনিয়র ভাই। দণ্ডনীয় অপরাধও পাবলিক প্লেসে ধূমপান। আগে ছেলেরা ধূমপান করলেও এভাবে করতো না। একটু আড়ালে করতো। যেন কোনো স্যার বা সিনিয়র ভাই না দেখেন। তখন তাস খেলা হতো কমনরুমে, শিক্ষা সফরে। শুধু তাই নয়Ñশিক্ষা সফরে স্যারদের সাথেও তাস খেলা হতো। এভাবে অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে উন্মুক্ত স্থানে তাস খেলা বা ছেলে-মেয়েদের ধূমপান শোভন নয়। এদৃশ্য যদি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক দেখেন মানসিকভাবে আহত হবেন তাঁরা। এ বিষয়গুলো নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন ভবনের করিডোরে, গাছের নিচে ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রুপ স্টাডি ও কোচিং করছে চাকরির জন্য। সবার হাতে বিসিএস গাইড। এসব স্টাডিতে চাকরি পাবার ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা সুবিধে হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যÑআত্মিক বিকাশ সাধন তথা মনুষত্ব অর্জন। শিক্ষা এই লক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে চাকরি কেন্দ্রিক, সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক শিক্ষায় পরিণত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য মৌলিক শিক্ষাÑশিক্ষা সৃষ্টি ও গবেষণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটা ভাববার বিষয়। - লেখক কলেজ শিক্ষক, কলামিস্ট ও সংগঠক
আকাশজমিন / আরআর