ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাপুরুষোচিত অপহরণের’ নিন্দা


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৫ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৪:২৮ পিএম

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক করার ঘটনায় দেশটিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এই ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত অপহরণ’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই অভিযানের সময় প্রেসিডেন্টের কয়েকজন দেহরক্ষীকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা’ করা হয়েছে এবং এতে ভেনেজুয়েলার সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটেছে।

রোববার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়কে সমর্থন করেন, যেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত জরুরি ছিল।

মাদুরো আটক হওয়ার ঘটনায় ভেনেজুয়েলার ভেতরে প্রতিক্রিয়া বিভক্ত। কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে কেউ কেউ এ ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন—এতে দেশটি আরও গভীর সংঘাতের দিকে এগোতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভও শুরু হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ‘খুব চড়া মূল্য’ দিতে হবে। দ্য আটলান্টিককে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “সে যদি সঠিক কাজ না করে, তবে তাকে খুব চড়া মূল্য দিতে হবে—সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।”

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার ভোররাতে মার্কিন বাহিনী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা বর্ষণ করে। এরপর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে একটি বিমান থেকে মাদুরোকে নামিয়ে ব্রুকলিনের একটি কারাগারে নেওয়া হয়। সোমবার ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে তার প্রথম হাজিরা দেওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রোববার ইঙ্গিত দেন, ভেনেজুয়েলার দৈনন্দিন শাসনে ওয়াশিংটন সরাসরি জড়াবে না। বরং বিদ্যমান ‘তেল অবরোধ’ ব্যবহার করে নীতিগত পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা হবে। তার বক্তব্য ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা আমরা চালাব’ মন্তব্যের পর সৃষ্ট উদ্বেগ প্রশমনের চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

রুবিওর এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই বিভক্ত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে অতীতের রাষ্ট্রগঠন প্রচেষ্টার স্মৃতি টেনে অনেকেই নতুন করে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

এসব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে রুবিও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে থাকা ‘পররাষ্ট্রনীতির প্রতিষ্ঠিত মহল’ ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দখলদারিত্বে যেতে চায় না, বরং কৌশলগত চাপ প্রয়োগই লক্ষ্য।

ফ্লোরিডার ডোরাল থেকে আল জাজিরার ফিল লাভেল জানান, ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে নির্বাচিত হয়েছেন, যার মূল দর্শন হলো বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো এবং মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে না ফেলা। তবে বাস্তবতায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। লাভেল বলেন, ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে ট্রাম্প বলেছেন, ‘মাঠে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না।’

এই অবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউনে বৃষ্টির মধ্যেও শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ‘ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা বন্ধ করো’ এবং ‘তেলের জন্য রক্ত নয়’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। এক বিক্ষোভকারী নিভেন বলেন, তিনি সামগ্রিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। তার ভাষায়, ‘তারা তেল চায়, করপোরেট ধনকুবেরদের সাহায্য করতে চায়। বোমাবর্ষণ তাদের ক্ষমতা গড়ার উপায়।’

শনিবার দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প তথাকথিত ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ প্রসঙ্গ খুব কমই উল্লেখ করেন, যা মাসের পর মাস ভেনেজুয়েলার জাহাজ ও স্থাপনায় বোমা হামলার প্রধান যুক্তি ছিল। বরং তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ‘চুরি করেছে’ এবং এখন তা ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে অবৈধ আখ্যা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় হারানো প্রতিটি জীবনই জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য তদন্ত ও অভিশংসনের মুখোমুখি করা উচিত।

সোমবার ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মুখপাত্র বলেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।

মাদুরো অপহরণের পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। কারাকাসে কিছু মানুষ এই ঘটনাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখলেও, অন্যরা মনে করছেন—এতে সংঘাত আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভের পাশাপাশি সরকারপন্থী সমাবেশও দেখা যাচ্ছে।

কারাকাসের মোটরসাইকেল আরোহী রোনাল্ড গৌলে বলেন, ‘সব ভেনেজুয়েলানের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া উচিত। ২৮ বছর ধরে একই সরকার চলছে; এখন এই দেশে রূপান্তরের সময়।’ তবে ব্যবসায়ী হুয়ান কার্লোস রিনকন রয়টার্সকে বলেন, ‘এর পেছনে অনেক কারসাজি আছে। আমরা শান্তি চাই এবং ভেনেজুয়েলার নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।’

বেকার ফ্র্যাঙ্কলিন হিমেনেজ জানান, তিনি সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নামবেন। তার ভাষায়, ‘মাদুরোকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এতে আরও বড় সংঘাত তৈরি হবে। বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে, নিজেদের ও মাতৃভূমি রক্ষা করতে হবে।’

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক ভেনেজুয়েলান দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন। তারা ভেনেজুয়েলা–কলোম্বিয়া সীমান্ত পেরিয়ে কলোম্বিয়ার কুকুতা শহরে যাচ্ছেন। সীমান্তঘেঁষা সান ক্রিস্তোবাল শহরের বাসিন্দা কারিনা রে জানান, পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইন, মানুষ ভীষণ উদ্বিগ্ন। সুপারমার্কেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কী হবে জানি না, তাই সবাই খাবার মজুত করতে চাইছে।’

কুকুতা থেকে আল জাজিরার আলেসান্দ্রো রামপিয়েত্তি জানান, শুরুতে অনেক ভেনেজুয়েলান মাদুরোর অপসারণে উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কিন্তু দ্রুতই সেই অনুভূতি অনিশ্চয়তায় রূপ নেয়। অনেকে আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো ও এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনবে। তবে বিদ্যমান নেতৃত্বের বড় অংশ বহাল থাকা এবং ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী নিয়োগে সেই আশা ম্লান হয়েছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার ওপর। তার মতে, এখনো তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যায়নি। তবে রাস্তায় সেনা মোতায়েন অস্থিরতা দমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী, সামরিক বাহিনীর অংশ এবং দেশে সক্রিয় কলোম্বীয় বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে—এই ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর