বাংলাদেশে শীতের সময় খেজুর রস পান করা একটি ঐতিহ্য হিসেবে প্রিয় হয়ে উঠেছে। একসময় গ্রামাঞ্চলে সহজলভ্য এই পানীয়, আজ শহুরে জীবনেও কাঙ্ক্ষিত। বিশেষ করে শীতের সকালে একগ্লাস কাঁচা খেজুর রস যেন ঐতিহ্য ও বিলাসের প্রতীক। কিন্তু সম্প্রতি অনলাইনে এর বিপজ্জনক বিপণন একটি উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পেজ ও অ্যাকাউন্ট খেজুরের কাঁচা রস ‘নিরাপদ’, ‘নিষ্কলুষ’, ‘খাঁটি’ দাবিতে বিক্রি করছে। রাজধানী ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজশাহী, গাজীপুরসহ দেশের নানা এলাকায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট যেমন খাঁটি বিডি, জারিফ ফুডস, ৬৪, খেজুরতলা, সাধ্যের মধ্যে, ফ্রেশ ফুড হাট ডটকম মাধ্যমে কাঁচা রস বাজারজাত করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে বলা হচ্ছে, গাছে জাল দিয়ে বাদুড় বা পাখির সংস্পর্শ এড়ানো হয় এবং রসটি ফ্রেশ ও এনার্জি ড্রিংক হিসেবে উপযোগী।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কাঁচা খেজুর রস মোটেও নিরাপদ নয়। এটি নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর একটি প্রমাণিত উৎস। নিপাহ একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস, যার কার্যকর চিকিৎসা নেই এবং মৃত্যুহার প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৪৩ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত পাঁচজনের সবাই মারা গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন বা অফলাইনে রস ফ্রিজে রেখে সরবরাহ করলেও ভাইরাসমুক্ত হয় না। ফ্রিজিংয়ের তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাস সক্রিয়ই থাকে। সাধারণ মানুষ সহজে কোন রসে ভাইরাস আছে তা শনাক্ত করতে পারে না।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, কাঁচা রস পান করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি নোংরা হাতে ভাত খাওয়ার মতো। সবাই অসুস্থ না হলেও আক্রান্তদের মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, খেজুরের কাঁচা রস ফুটিয়ে পান করা বা পিঠা ও গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা একমাত্র নিরাপদ উপায়।
সরকারি দপ্তর, বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা সংস্থা বারবার সতর্ক করলেও অনলাইন ব্যবসায়ীরা অবাধে বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
খেজুরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চাইলে অবশ্যই নিরাপদভাবে খাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞরা অনুরোধ করছেন, খেজুরের রস কাঁচা না খেয়ে সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করুন এবং অনলাইনে অপ্রমাণিত বিক্রয় বন্ধে নজর দিন।