ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বাংলাদেশি বলে ভারতে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৭:২৭ পিএম

ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত ও কর্মরত মুসলিমদের ওপর চালানো হচ্ছে সহিংসতা ও নির্মম নিপীড়ন। এতে আতঙ্কে অনেকেই সবকিছু ছেড়ে নিজ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবিকা হারিয়ে তারা পড়ছেন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওড়িশাসহ একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহু মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কর্মস্থল ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে আসছেন।

এই সহিংসতার ফলে তারা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন। পরিবার চালানো নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম সংকট। নির্যাতনের সর্বশেষ শিকার হয়েছেন ইজাজ আলী নামে এক মুসলিম যুবক। তিনি ওড়িশার সম্বলপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। গত রোববার সেখানে হিন্দুত্ববাদীদের একটি দল তার ওপর এবং তার সঙ্গে থাকা অন্য শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। বাংলাদেশি ট্যাগ দিয়ে তাদের মারধর করা হয়। এতে ইজাজ আলীর একটি হাত ভেঙে যায়।

সহিংসতা ও আতঙ্কের কারণে ওড়িশার পাশাপাশি ছত্রিশগড় এবং এর পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে বসবাসরত মুসলিম শ্রমিকরাও ভয়ে কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হতে পারে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ওড়িশার সম্বলপুরের পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, ইজাজ আলীকে নির্যাতন করে হাত ভেঙে দেওয়ার পর সেখানে ছুটে যেতে হয় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে। তিনি সেখানে অবস্থানরত বাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

২৭ বছর বয়সী ইজাজ আলী পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ধুলিয়ানের বাসিন্দা। মাত্র দুই মাস আগে তিনি কাজের সন্ধানে ওড়িশার সম্বলপুরে যান। সেখানে একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন। ইজাজ জানান, পশ্চিমবঙ্গে একই কাজ করলে দৈনিক মাত্র ৪০০ রুপি মজুরি পাওয়া যায়, অথচ বাইরে গেলে প্রায় এক হাজার রুপি আয় করা সম্ভব। এই আশাতেই তিনি পরিবার ছেড়ে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যান।

কিন্তু তার সেই স্বপ্ন দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। গত সপ্তাহে হিন্দুত্ববাদীদের একটি দল তার থাকার ঘরে জোরপূর্বক ঢুকে পড়ে। তারা ইজাজ আলী ও তার সঙ্গে থাকা অন্য শ্রমিকদের কাছে আধার ও ভোটার কার্ড দেখতে চায়। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও হামলাকারীরা তাদের মুসলিম পরিচয় দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

ইজাজ আলী বলেন, “আমরা আধার ও ভোটার কার্ড দেখিয়েছি। কিন্তু তারা যখন বুঝতে পারে আমরা মুসলিম, তখন বলে—‘তোমরা বাংলাদেশি, ভারতীয় নও।’ এরপর লোহার রড দিয়ে আমাদের মারধর শুরু করে। আমরা বাঁচার জন্য চিৎকার করতে থাকি এবং কোনোমতে পালিয়ে যাই। তারা আমাদের টাকা, মোবাইল ফোন সব নিয়ে নেয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমি জানি না এখন কী করব। বাড়িতে খবর দিলে পরিবার আমাকে দ্রুত ফিরে আসতে বলে। এখন কাজ নেই, টাকাও নেই। শুধু ভয় নিয়ে বেঁচে আছি।”

এই ঘটনার পর সম্বলপুরসহ আশপাশের এলাকায় থাকা বহু মুসলিম শ্রমিক ভয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। অনেকেই গভীর রাতে এলাকা ছেড়ে চলে যান। কেউ কেউ আবার লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন।

ঠিক একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ছত্রিশগড়ে বসবাসরত আরও তিন মুসলিম ব্যক্তি। তারা সবাই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। ২৮ বছর বয়সী ইয়াদুল, ৩০ বছর বয়সী নিয়ামুল এবং ৬৫ বছর বয়সী হানিফ ছত্রিশগড়ের নারায়ণপুর নামে একটি শহরে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন।

তারা জানান, কাজের অর্ডার আনতে নারায়ণপুর যাওয়ার সময় মহাসড়কে আটজনের একটি দল তাদের পথরোধ করে। ওই দলটি প্রথমে তাদের আধার কার্ড দেখতে চায়। কার্ডে নাম ও পরিচয় দেখে বুঝতে পেরে যে তারা মুসলিম, তখনই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় তাদের।

ভুক্তভোগীরা বলেন, হামলাকারীরা তাদের বাংলাদেশি বলে গালিগালাজ করে এবং ভারত ছাড়ার হুমকি দেয়। প্রাণে বাঁচতে তারা কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। এরপর আর সাহস করে কাজে যাননি।

টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণা চলছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মুসলিম শ্রমিকরা সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের বাংলাদেশি বলে আখ্যা দিয়ে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।

এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র ও শ্রমজীবী মুসলমানরা। কাজের খোঁজে যারা ভিনরাজ্যে যান, তাদের অনেকেই এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন। অনেকে আবার সবকিছু ছেড়ে নিজ রাজ্যে ফিরে আসছেন। ফলে পরিবার চালানোর মতো আয়ের উৎসও হারাচ্ছেন তারা।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের সহিংসতা ভারতের সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ভয়ংকর হুমকি। পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে নির্যাতন করা আইন ও সংবিধানবিরোধী। তারা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মুসলিম শ্রমিক। জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা আজ চরম সংকটে পড়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া


এ সম্পর্কিত আরো খবর