ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

মুড়লীর ২২৩ বছরের পুরোনো ইমামবাড়া


  • আপলোড সময় : রবিবার ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৪:২০ পিএম

যশোর সংবাদদাতা 

যশোর সদর উপজেলার মুড়লীতে অবস্থিত হাজি মুহম্মদ মুহসীনের ইমামবাড়া স্থানীয়ভাবে খুব পরিচিত। মুড়লীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২২৩ বছরের পুরোনো এই সাদা ভবন। এটি মূলত মহররমের অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য নির্মিত একটি ইমামবাড়া বা সম্মেলনকক্ষ। স্থানীয়রা এটিকে হাজি মুহম্মদ মুহসীনের ইমামবাড়া নামে চেনেন। মোগল আমলের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবে এটি বিবেচিত। যশোর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ইমামবাড়া সমতল ছাদবিশিষ্ট, আয়তাকার এবং মোগল স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার মুড়লীর ওই ইমামবাড়া হাজি মুহম্মদ মুহসীনের সৎবোন মন্নুজান খানম ১৮০২ সালে নির্মাণ করেছিলেন। ইমামবাড়াটির মূল অংশ একটি সভাকক্ষ, যা উত্তর-দক্ষিণে ১৮ দশমিক ২৯ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫ দশমিক ২৪ মিটার বিস্তৃত। অভ্যন্তর ভাগ ১০টি স্তম্ভের দ্বারা তিন সারিতে বিভক্ত। খিলানগুলো খাঁজকাটা এবং নকশাযুক্ত, পলেস্তারার ওপর ফুলের নকশা এবং ছাদের সিলিংয়ে স্টাকো নকশা রয়েছে। সামনে চার ধাপে সিঁড়ি রয়েছে। এটি শিয়া মুসলমানদের একটি অন্যতম পাদপীঠ হিসেবে বিবেচিত।

প্রায় ২২৩ বছরের প্রাচীন এই স্থাপনা বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে রয়েছে। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ এটি সরকারি প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়। ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে মুড়লীর ইমামবাড়ার কথা উল্লেখ আছে। মিত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুহসীনের মোতোওয়ালিদিগের (ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপক) সময়ে নির্মিত এই ইমামবাড়া সমতল ছাদবিশিষ্ট এবং মোগল স্থাপত্যকলার নিদর্শন বহন করে।

হাজি মুহম্মদ মুহসীন ১৭৩২ সালের আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ। পরিবারের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন সুদূর ইরান বা পারস্য থেকে, তবে তাদের আদি বাস ছিল আরবে। দিল্লির মসনদে তখন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব শাসন করছিলেন। সম্রাটের বিচারালয়ের সম্মানিত সদস্য ছিলেন আগা মোতাহার। সম্রাটের সন্তুষ্টিতে যশোর, হুগলি, নদীয়া ২৪ পরগনা জেলার প্রচুর জমি আগা মোতাহারকে দেওয়া হয়। পরে হুগলিতে বসবাস শুরু করেন তিনি।

আগা মোতাহারের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী একমাত্র মেয়ে মন্নুজান। কিছুদিন পর আগা মোতাহারের মৃত্যু হয়। একপর্যায়ে আগা মোতাহারের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেন মুহসীনের বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ। ফলে মন্নুজান হয়ে যান মুহসীনের সৎবোন। মাবাবা মারা যাওয়ার পর ভাইবোন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। বিশাল সম্পত্তির মালিক হন মন্নুজান। একসময় তিনি বিয়ে করেন আগা সালাউদ্দিনকে, যিনি কর্মসূত্রে ইরান থেকে হুগলিতে এসেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান মন্নুজান সম্পত্তি মুহসীনকে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রথমে মুহসীন রাজি হননি। অবশেষে ১৮০২ সালে সমুদয় সম্পত্তি লন্ডনের সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে মুহসীনকে দান করা হয়। পরে ১৮০৬ সালের ২০ এপ্রিল হুগলিতে এক অসিয়তনামা রেজিস্ট্রি করা হয়।

দানবীর হাজি মুহম্মদ মুহসীন ইমামবাড়া কার্যকরী সমন্বয় পরিষদের সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, মুড়লীর ইমামবাড়া প্রায় ২২৩ বছরের পুরোনো। এখানে বছরে পাঁচটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়। সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান পবিত্র আশুরা ইমাম হোসাইনের চল্লিশা। ইমামবাড়ার কার্যক্রম স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ঐতিহাসিক এই ইমামবাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে সংস্কারও করে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে ইমামবাড়ার সংস্কার করা হয়েছে।

ইমামবাড়ার স্থাপত্যশৈলী মোগল আমলের নিদর্শন বহন করে। মূল ভবন সাদা পাথরের তৈরি, ছাদ সমতল এবং অভ্যন্তর স্টাকো নকশা ফুলের নকশা দ্বারা সজ্জিত। সভাকক্ষের আয়তন যথেষ্ট প্রশস্ত, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য উপযোগী। খিলানগুলো খাঁজকাটা, যা স্থাপত্যশিল্পে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চার ধাপে সিঁড়ি প্রধান প্রবেশপথকে উজ্জ্বল আকর্ষণীয় করে তোলে।

ইতিহাস, স্থাপত্য এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সংযুক্তি এই ইমামবাড়াকে শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মুড়লীর ইমামবাড়া স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য এক ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন।

হাজি মুহম্মদ মুহসীনের পরিবার পূর্বপুরুষদের ইতিহাসও এই স্থাপনার সাথে জড়িত। পারস্য থেকে আগত পরিবার, মোগল সম্রাটের সম্মান, জমি সম্পত্তি এবং স্থানীয় সমাজে অবদানসবকিছু মিলিয়ে ইমামবাড়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

আজও এই ইমামবাড়া ধর্মীয়, সামাজিক এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর হাজারো মানুষ পবিত্র আশুরা, চল্লিশা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান উদ্যাপন করতে এখানে আসে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়মিত সংরক্ষণ সংস্কারের ফলে ভবনের মূল নকশা এবং স্থাপত্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়েছে।

ইমামবাড়ার ইতিহাস, স্থাপত্য, স্থানীয় সমাজে ভূমিকা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর কারণে এটি যশোর জেলার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয়।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর