মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
পদ্মা সেতু, ইলিশ আর মুক্ত দক্ষিণা বাতাস—সব মিলিয়ে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত এখন যেন প্রকৃতির এক অনাবিল সৌন্দর্যের নাম। ইট-পাথরের কর্মব্যস্ত কংক্রিট নগরী ছেড়ে মানুষ এখন ছুটছে নদীর কাছে, খোলা আকাশের নিচে একটু প্রশান্তির খোঁজে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর মাওয়া প্রান্তের পুরাতন শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকা নতুন করে পরিচিতি পাচ্ছে পর্যটন সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে।
এই এলাকায় এসে সবচেয়ে বড় যে বিস্ময়ের মুখোমুখি হচ্ছেন পর্যটকরা, তা হলো একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল অভিজ্ঞতা। পদ্মা সেতু প্রকল্প রক্ষা বাঁধের তীর ঘেঁষে দাঁড়ালে ভোরের প্রথম আলো যেমন চোখে পড়ে, তেমনি বিকেলের শেষ আলোও দেখা যায় একই জায়গা থেকে। নদীর বুকে সূর্যের আলো-ছায়ার এই খেলা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দিন দিন বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠছে।
সপ্তাহের ছুটির দিন কিংবা বিশেষ কোনো দিনে শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা নবদম্পতিদের ভিড়। কেউ আসছেন শুধু প্রকৃতি উপভোগ করতে, কেউবা আবার পদ্মা নদীতে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা প্রমোদতরিতে ঘুরে দেখতে। নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা ট্রলারে বসে পদ্মা সেতুর বিশাল কাঠামো আর নদীর প্রশস্ততা দেখার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকছে।
পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম বড় কারণ পদ্মার তাজা ইলিশ। শিমুলিয়া ফেরিঘাট ও মাওয়া প্রান্তজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই শতাধিক ছোট-বড় খাবার হোটেল। এসব হোটেলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইলিশ ভাজা, ইলিশ ভুনা, ইলিশের ঝোলসহ নানা রকম পদে জমে উঠছে ভোজনরসিকদের ভিড়। অনেক পর্যটকই পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে নদীর ধারে বসে গরম ভাত আর ইলিশের স্বাদ নিতে পছন্দ করছেন।
এছাড়াও রয়েছে প্রমোদতরিতে বিলাসীভাবে ইলিশ ভোজনের ব্যবস্থা। নদীর বুকে ভাসমান অবস্থায় খাবার খাওয়ার এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই নতুন। পাশাপাশি পদ্মা পাড়ে তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ভাসমান হোটেল, যেখানে পর্যটকদের আনাগোনা দিন দিন বাড়ছে। সন্ধ্যার পর এসব ভাসমান হোটেলে আলোর ঝলকানি নদীর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
তবে এই বাড়তে থাকা পর্যটনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সমস্যাও প্রকট হয়ে উঠছে। পর্যটকদের অভিযোগ, শিমুলিয়া ফেরিঘাট ও মাওয়া প্রান্তে পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি নেই। ফলে রোদ-বৃষ্টি বা কনকনে শীতে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দর্শনার্থীদের। একই সঙ্গে গাড়ি পার্কিং সুবিধা সীমিত হওয়ায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন টয়লেটের অভাবও বড় একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পর্যটকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইঞ্জিন চালিত ট্রলার কিংবা প্রমোদতরিতে পদ্মা ভ্রমণের ক্ষেত্রে নেই পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার বা জরুরি ব্যবস্থার তেমন কোনো প্রস্তুতিও চোখে পড়ে না। এতে অনেক পর্যটকই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, তদারকি না থাকায় নদীতে ঘুরাতে নিয়ে ফেরার পথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয় সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছ থেকে। অনেক সময় চুক্তির বাইরে গিয়ে বাড়তি টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেননি সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিক মন্ডল দাবি করেছেন, ঘাট এলাকায় একটি বড় সিন্ডিকেট চক্রের নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে। তার মতে, নির্দিষ্ট তদারকি ও নিয়ম-কানুন না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায় ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ভাড়া করে নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাওয়া প্রান্তে আগত দর্শনার্থীরা। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রলারে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়েও পদ্মা ভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন অনেকে। স্পিডবোটে ঘোরার ক্ষেত্রে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
রাজধানীর গুলশান থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, পরিবার নিয়ে একটু প্রশান্তির জন্য পদ্মা পাড়ে এসেছেন। তবে তার অভিযোগ, এখানে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দৃশ্যমান কোনো তদারকি নেই। ইঞ্জিন চালিত ট্রলারগুলো সীমিত সময়ের জন্য যেভাবে খুশি নদীতে ঘুরিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে, তা নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে, পৌষের কনকনে শীত উপেক্ষা করে সুদূর জার্মান থেকে দেশে ঘুরতে আসা এক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, বহিবিশ্বের অনেক সুন্দর জায়গা দেখলেও পদ্মা পাড়ের সৌন্দর্য তাকে আলাদা করে মুগ্ধ করেছে। দেশে ফেরার আগেই তিনি ঠিক করেছিলেন পদ্মা সেতু দেখবেন, পদ্মা পাড়ে সময় কাটাবেন এবং তাজা ইলিশ খাবেন। সেই ইচ্ছা পূরণ হলেও কিছু অব্যবস্থাপনায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
মাওয়া প্রান্তে সূর্যাস্তের সময় পদ্মা পাড়ে ঘুরতে আসা সদ্য বিবাহিত এক দম্পতির অভিজ্ঞতাও আলাদা। তারা সূর্যাস্তের সঙ্গে নিজেদের সুন্দর মুহূর্তের ছবি মুঠোফোনে ধারণ করেছেন। তবে ঘাট এলাকায় যাত্রী ছাউনি ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায় তাদের ভোগান্তির কথাও জানান।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা পাড়ের এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের মতো নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তুলতে হলে নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দিতে হবে। নইলে একদিকে যেমন পর্যটনের সম্ভাবনা নষ্ট হবে, অন্যদিকে হুমকিতে পড়বে নদীর জীববৈচিত্র্য ও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন-জীবিকা।
সব মিলিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একই স্থানে দেখার বিরল সুযোগ, পদ্মা সেতু, নদীর বিশালতা আর ইলিশের স্বাদ—সবকিছু মিলিয়ে মাওয়া প্রান্ত এখন নতুন এক পর্যটন দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে প্রয়োজন সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ।
আকাশজমিন / আরআর