আন্তর্জাতিক ডেস্ক
টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান সরকার। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিংবা বিক্ষোভকারীদের সহায়তাকারীদের ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেলের এমন ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, চলমান গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ সতর্ক করে জানিয়েছেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নেবেন, তাদের ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইরানি আইনে এই অভিযোগ ‘মোহরেব’ হিসেবে পরিচিত এবং এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এমনকি যারা ‘দাঙ্গাকারীদের সহায়তা করেছে’, তাদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনা হবে।
ইরানের আইনের ১৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতায় জড়ায়, তবে সেই সংগঠনের লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত থেকে যারা সহায়তা করে, তাদেরও ‘মোহরেব’ বা খোদার শত্রু হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই আইনের আওতায় সরাসরি সশস্ত্র কার্যক্রমে অংশ না নিলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা সম্ভব।
আইনের ১৯০ ধারায় ‘মোহরেব’ অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তিগুলো অত্যন্ত কঠোর। এসব শাস্তির মধ্যে রয়েছে মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসি, ডান হাত ও বাম পা কেটে ফেলা অথবা আজীবন দেশের ভেতরে নির্বাসন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ধারার প্রয়োগ বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভরত ইরানিদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন না চালানোর জন্য ইতোমধ্যে ইরানকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ইরান সরকার জানিয়েছে, যারা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে এবং দেশের ওপর বিদেশি আধিপত্য কায়েম করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচার ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব মামলার শুনানিতে কোনো ধরনের শৈথিল্য, সহানুভূতি বা ছাড় দেওয়া যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়েছেন এবং দুই হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানী তেহরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে এবং মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি শনিবার ও রোববার নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের শাহ আমলের সিংহ ও সূর্য চিহ্নিত পুরোনো জাতীয় পতাকা এবং অন্যান্য জাতীয় প্রতীক নিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৪ লাখের বেশি রিয়ালে পৌঁছায়। এর পর থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
আকাশজমিন / আরআর