সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 211
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামের নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরি করে নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। হেমন্তের শিশিরমাখা ভোরে শীতের নরম রোদে আলোকিত হয়ে ওঠে গ্রামটির প্রতিটি উঠোন। ঘরের কাজ সামলে সকাল থেকেই নারীরা বসে পড়েন বড়ি তৈরির কাজে। চারপাশজুড়ে তখন এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির উঠোনে শীতল পাটির ওপর সাদা কাপড় বিছিয়ে সারি সারি কুমড়ো বড়ি সাজানো হচ্ছে। রজিনা, হালিমা, শাপলা, রজনীর মতো শতাধিক নারী নিপুণ হাতে চালকুমড়া ও মাষকলাই ডালের মিশ্রণে বড়ি তৈরি করছেন। তাদের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া বড়িগুলো রোদের তাপে ধীরে ধীরে শুকিয়ে বিক্রির উপযোগী করা হচ্ছে। এই ব্যস্ততা চলে প্রতি বছর হেমন্ত ও শীত মৌসুম জুড়ে, সাধারণত মার্চ মাস পর্যন্ত।
একসময় বড়ি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই ছিল কষ্টসাধ্য। ঢেঁকিতে ডাল ভাঙা, হাতে মণ্ড নেড়ে প্রস্তুত করা—সবকিছুতেই সময় ও শ্রম বেশি লাগত। এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মেশিনের সাহায্যে মণ্ড তৈরি হওয়ায় উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি শ্রমও অনেক কমেছে। তবে স্বাদ, ঐতিহ্য ও নিখুঁত কারুকাজে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বংশপরম্পরায় এই পেশায় যুক্ত নওগাঁ গ্রামের নাজমা খাতুন বলেন, “আমার বাপ-দাদারা বড়ি বানাতেন, তারপর আমার মা। সেখান থেকেই আমি শিখেছি। এখনো আমাদের পরিবারের সবাই মিলে বড়ি বানাই। আগে কাজটা খুব কষ্টের ছিল, এখন মেশিনের কারণে সহজ হয়েছে। তবে বড়ি বানানো আমাদের কাছে শুধু আয় নয়, এটা আমাদের ঐতিহ্য।”
কুমড়ো বড়ি বিক্রি করে গ্রামের নারীরা অল্প কয়েক মাসেই পুরো বছরের একটি বড় অংশের খরচ জোগান দিতে পারেন। বর্তমানে বাজারে সাধারণ মানের কুমড়ো বড়ি প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর উন্নত উপকরণ ও নিখুঁতভাবে তৈরি প্রিমিয়াম মানের বড়ির দাম কেজিতে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। শুধু স্থানীয় বাজার নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের কাছেও নওগাঁ গ্রামের কুমড়ো বড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
স্থানীয় নারীদের মতে, এই শিল্পের সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা বাড়ানো হলে কুমড়ো বড়ি শিল্পকে আরও বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব। এতে গ্রামের আরও অনেক নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন।
এ বিষয়ে জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ টি এম গোলাম মাহবুব বলেন, কুমড়ো বড়ি তৈরি করে এই অঞ্চলের অনেক নারী আজ স্বাবলম্বী। প্রশিক্ষণ, ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে আরও নারীদের এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
কুমড়ো বড়ি আজ শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি সিরাজগঞ্জের নারীদের শ্রম, ঐতিহ্য ও আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আকাশজমিন / আরআর