মিয়ানমারে বিলিয়ন ডলারের অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়ে একই পরিবারের ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে চীন। কুখ্যাত অনলাইন প্রতারণা, হত্যা, অবৈধ আটক ও জালিয়াতিসহ একাধিক গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সম্প্রতি এই রায় কার্যকর করা হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, উত্তর মিয়ানমারে সক্রিয় একটি ভয়ংকর অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় এই ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা চিনহুয়া জানায়, অভিযুক্তরা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্রতারণা ও সহিংস অপরাধ পরিচালনা করছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্তরা উত্তর মিয়ানমারের তথাকথিত ‘চার পরিবারের’ একটি—মিং পরিবারের সদস্য। এই পরিবারটির বিরুদ্ধে শত শত অপরাধকেন্দ্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এসব কেন্দ্রে অনলাইন জালিয়াতি, অবৈধ আটক, পতিতাবৃত্তি ও মাদক উৎপাদনের মতো অপরাধ সংঘটিত হতো। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের অনেক সদস্য স্থানীয় সরকার ও মিয়ানমারের সামরিক জান্তাসংশ্লিষ্ট মিলিশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদে যুক্ত ছিলেন।
চিনহুয়া জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের অপরাধের কারণে অন্তত ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে আদালতে প্রমাণিত হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আদালত এই ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে সম্প্রতি সেই রায় কার্যকর করা হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন। মামলাটি পরবর্তীতে চীনের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম পিপলস কোর্টে শুনানি পর্যায়ে যায়। সেখানে বিচার শেষে নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় বহাল রাখা হয়।
মিং পরিবারের প্রধান ছিলেন মিং শুয়েচাং। তার নেতৃত্বেই মিয়ানমার-চীন সীমান্তবর্তী কোকাং অঞ্চলের কুখ্যাত ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ নামের একটি অপরাধকেন্দ্র পরিচালিত হতো। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এই চক্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কাজ করত। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেককে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হতো এবং অমানবিক পরিবেশে রাখা হতো।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোকাং অঞ্চলের রাজধানী লাউক্কাইং দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক অনলাইন প্রতারণা শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব এলাকায় পাচার হওয়া শ্রমিকদের ব্যবহার করে অত্যাধুনিক কৌশলে প্রতারণা চালানো হতো। দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক মহলে চাপের মুখে ২০২৩ সালে চীন এসব অপরাধকেন্দ্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে।
ওই বছরের নভেম্বরে চীন মিং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে এবং তাদের ধরিয়ে দিতে বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে। পরবর্তীতে গোষ্ঠীর প্রধান মিং শুয়েচাং আটক অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। তিনি একসময় মিয়ানমারের একটি অঙ্গরাজ্যের সংসদ সদস্যও ছিলেন।
যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের মধ্যে মিং শুয়েচাংয়ের ছেলে মিং গুওপিং এবং নাতনি মিং ঝেনঝেনও ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে চিনহুয়া।
আকাশজমিন / আরআর