আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জান্তাশাসিত মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের সময় দেশটির বিমান বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ও ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। এসব বিমান হামলায় অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালে এমন প্রাণঘাতী অভিযান দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক সংকট ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর প্রায় পাঁচ বছর পর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক সরকার একটি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় ভোটগ্রহণের কথা জানানো হয়। সামরিক জান্তা এই নির্বাচনকে ‘বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
তবে ঘোষণার শুরু থেকেই নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠতে থাকে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোটের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায়’ দেশের মোট ১২১টি আসনে ভোটগ্রহণ করা হবে না। এই সিদ্ধান্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দেশের একটি বড় অংশ কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণানুযায়ী গত ২৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ শেষ হয়। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত দল ইউনিয়ন অ্যান্ড সলিডারিটি পার্টি (ইউএসডিপি)। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশ এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি অথবা অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচনের সময়কালেই সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র সামনে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান বাহিনী কমপক্ষে ৫০৮টি ছোট-বড় বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানের ফলেই অন্তত ১৭০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের মিয়ানমার শাখার প্রধান জেমস রোডেহ্যাভের এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই মিয়ানমারের বিমান বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা জোরদার করে। নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব হামলার মাত্রা আরও বেড়ে যায় এবং ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।
নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর পাশাপাশি কয়েকজন নির্বাচনী প্রার্থীও ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্ক এই নির্বাচনকে ‘ভুয়া এবং সামরিক বাহিনীর সাজানো নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সামরিক জান্তা নির্বাচনের নামে মূলত ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল বাস্তবায়ন করেছে। বিমান হামলা, গ্রেপ্তার অভিযান ও বিরোধী কণ্ঠ দমনের মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বিমান হামলার কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধ সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সামরিক জান্তা এখনো এসব আহ্বানে কার্যকর কোনো সাড়া দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় চালানো বিমান হামলা প্রমাণ করে যে, সামরিক সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তরিক নয়। বরং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধী শক্তিকে দমন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এতে করে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি