ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনার সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বাংলাদেশ সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়, যেগুলোর লিখিত উত্তর সংসদে পাঠ করে শোনানো হয়। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ইস্যু এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সমীকরণ নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) লোকসভায় বাংলাদেশ বিষয়ক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং। তাকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে কোনো স্পর্শকাতর বা সংকটপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে কি না এবং পাকিস্তান এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কি না, যা ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
জবাবে কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, “প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক; এমনকি আমাদের সামাজিক বন্ধনও অভিন্ন। আমাদের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল লক্ষ্য হলো জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন।” তিনি আরও জানান, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়মিত বৈঠক ও পারস্পরিক মতবিনিময় অব্যাহত রয়েছে।
পাকিস্তান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কোনো সুযোগ নিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য দেশগুলোর থেকে স্বাধীন।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়, তৃতীয় কোনো দেশের প্রভাব বা ভূমিকার ওপর এই সম্পর্ক নির্ভরশীল নয়।
এছাড়া তিনি বলেন, বাংলাদেশের যেসব জায়গায় ভারতের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
লোকসভায় আরেক প্রশ্নে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। প্রশ্ন করা হয়, কথিত প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা নিয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেছে কি না। জবাবে কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, “ভারত ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকসহ সকল প্রাসঙ্গিক পরিবেশে উত্থাপন করে আসছে।” তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়টি তুলেছেন এবং গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
আরেকটি প্রশ্নে ‘বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জোট’ প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। প্রশ্নে বলা হয়, এই তিন দেশের সঙ্গেই ভারতের সবচেয়ে বেশি সীমান্ত রয়েছে। ফলে এমন কোনো জোট ভারতের জন্য সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করতে পারে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়।
এর উত্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভারত সরকার ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি সংক্রান্ত স্বার্থের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং এগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।”
তিনি আরও বলেন, ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতির আওতায় ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে ভারত সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি