সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 111
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ভুট্টা চাষ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করায় কৃষকদের মধ্যে বাম্পার ফলনের আশা জেগেছে। জেলার মাঠের পর মাঠ এখন ভুট্টার সবুজে ঢাকা। চোখজুড়ানো এই সবুজ সমারোহ শুধু কৃষকদের মুখেই হাসি ফোটাচ্ছে না, বরং জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও নতুন আশার সঞ্চার করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রোপা আমন ধান কাটার পর অধিকাংশ জমিতে কৃষকরা বিকল্প ফসল হিসেবে ভুট্টা চাষে ঝুঁকেছেন। সময়মতো জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ভুট্টা চাষে আগ্রহ দিন দিন বেড়েছে।
জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই ভুট্টা চাষ হলেও উল্লাপাড়া, চৌহালী, কামারখন্দ, তাড়াশ, কাজিপুর এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলে এর বিস্তার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বালুকাময় জমিতে ভুট্টা ভালো ফলন দেয় বলে কৃষকরা এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। একসময় যে সব জমিতে শুধুমাত্র ধান আবাদ হতো, সেখানে এখন সারি সারি ভুট্টার গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধানের তুলনায় ভুট্টা চাষে খরচ কম হলেও লাভের পরিমাণ বেশি। জমি প্রস্তুত, সেচ ও পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় অল্প পুঁজি নিয়ে চাষ করেও ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। অনেক কৃষক জানান, ধান চাষে যেখানে নানা ঝুঁকি থাকে, সেখানে ভুট্টা চাষে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কম।
কৃষকরা জানান, আগামী দেড় মাসের মধ্যেই ভুট্টার ক্ষেত সোনালি রঙ ধারণ করবে এবং ঘরে তোলার প্রস্তুতি শুরু হবে। ইতোমধ্যে অনেক জমিতে ভুট্টার থোর বের হয়েছে, যা ভালো ফলনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম।
উৎপাদিত ভুট্টা মূলত গো-খামার ও মুরগির খামারের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে ভুট্টার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি ভুট্টার আটা দিয়ে রুটি, পিঠা ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। ফলে স্থানীয় বাজার ছাড়াও জেলার বাইরেও সিরাজগঞ্জের ভুট্টার ভালো চাহিদা রয়েছে।
কৃষকদের দাবি, ভুট্টার গড় উৎপাদন প্রতি বিঘায় ২৭ থেকে ২৮ মণ পর্যন্ত হতে পারে। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে উৎপাদন আরও বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। শুধু ভুট্টার দানা নয়, এর পাতা গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগে। ফলে একটি জমি থেকেই কৃষকরা একাধিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
সদর উপজেলার এক কৃষক জানান, আগে তিনি একই জমিতে ধান চাষ করতেন। কিন্তু ভুট্টা চাষ করে তিনি কম খরচে বেশি লাভ পাচ্ছেন। বাজারে দাম ভালো থাকলে ভুট্টা চাষ তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা বলেন, “ভুট্টা চাষে প্রান্তিক কৃষকদের উৎসাহিত করতে আমরা বীজ ও সার বিতরণ করেছি। সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কৃষকদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভুট্টা চাষে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ভুট্টা একটি লাভজনক ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফসল। ধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। সিরাজগঞ্জে ভুট্টা চাষের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের আগ্রহের ফলে সিরাজগঞ্জে ভুট্টা চাষ একটি সম্ভাবনাময় কৃষি খাতে পরিণত হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে বাম্পার ফলনের এই প্রত্যাশা জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকরা যদি ন্যায্যমূল্য পান, তাহলে ভুট্টা চাষ সিরাজগঞ্জে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর