আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনা এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে কাতারে শক্তিশালী মোবাইল মিসাইল লঞ্চার মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বন্ধুপ্রতিম দেশ কাতারের ভূখণ্ডে এই সামরিক সরঞ্জাম স্থাপনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, অঞ্চলজুড়ে তাদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনের উদ্ধৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটির নিরাপত্তা জোরদার করাই এই মোতায়েনের প্রধান উদ্দেশ্য।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাত চলাকালে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। এতে ঘাঁটির অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। বর্তমান মোবাইল মিসাইল লঞ্চার মোতায়েনকে সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং তুরস্কে মার্কিন সেনাঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি আয়তন, অবকাঠামো এবং কৌশলগত গুরুত্বের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে এটি সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেও বিবেচিত হয়ে থাকে।
ইরানের পরমাণু প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত দুই দশক ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর বৈরিতা নতুন মাত্রা পায়। ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে। যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে আরেকটি কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের বিষয়টি উল্লেখ করছেন। গত ডিসেম্বরে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তেহরান অভিযোগ তোলে যে, পশ্চিমা শক্তিগুলো এতে উসকানি দিচ্ছে। এই অভিযোগের পর সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আরব সাগরে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’সহ একাধিক শক্তিশালী রণতরী মোতায়েন করে।
বর্তমানে আরব সাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পাঁচটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ও কয়েক শ রণতরী টহল দিচ্ছে। এই সামরিক উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধমূলক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
কাতারে মোবাইল মিসাইল লঞ্চার মোতায়েনের ফলে আল-উদেইদ ঘাঁটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ধরনের মোবাইল লঞ্চার দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে এবং আকাশ ও স্থলভিত্তিক হুমকি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। ফলে এটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাই নয়, বরং সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলারও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন ইরানের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা— আল-উদেইদ ঘাঁটি কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা হলে তার দ্রুত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এটি কাতারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
তবে এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে, অন্যদিকে তা উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো সামরিক অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এই অঞ্চল বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল অনুসরণ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কিন্তু সামান্য ভুল পদক্ষেপ বা ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে— এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, কাতারে মোবাইল মিসাইল লঞ্চার মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি যেমন কৌশলগত প্রতিরক্ষা জোরদারের পদক্ষেপ, তেমনি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
আকাশজমিন
/ আরআর