শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিণ বৈশাখীপাড়া এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর একটি নির্বাচনী কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। এ সময় কার্যালয়ের ভেতর থেকে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা এক পোলিং কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারক কমিটির বিচারক ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুজন মিয়া সংক্ষিপ্ত বিচার পরিচালনা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত পোলিং কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে পরে নড়িয়া থানার পুলিশের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার বিকেলে নড়িয়া পৌরসভার একটি ভাড়া বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ওই বাড়িটি শরীয়তপুর–২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহমুদ হোসেনের নির্বাচনী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। অভিযোগ ছিল, সেখান থেকে নির্বাচনী কাজে অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে। খবর পেয়ে নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
অভিযানের সময় কার্যালয়ের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি টাকা বিতরণের একটি তালিকা, একটি ল্যাপটপ ও একটি হার্ডডিস্ক জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জব্দ করা আলামতগুলো পরবর্তী তদন্তের স্বার্থে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অভিযানের সময় কার্যালয়ে কয়েকজন দলীয় কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান চলাকালে সেখান থেকে গোলাম মোস্তফা নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তিনি নড়িয়ার ১২৭ নম্বর হাজী সৈয়দ আহম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এছাড়া তিনি উপজেলার পঞ্চপল্লী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস বলেন, নির্বাচনী কাজে টাকা বিতরণের খবর পাওয়ার পর যৌথ বাহিনী সেখানে যায়। তিনি নিজেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি জানান, কার্যালয়ের ভেতর থেকে নগদ অর্থ, তালিকা ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে পাওয়া যায়, যিনি একটি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কেন ওই কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন, সে বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পরে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারক কমিটির বিচারক আদালত বসিয়ে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
শরীয়তপুর–২ আসনে নির্বাচনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহমুদ হোসেন এবং বিএনপির প্রার্থী সফিকুর রহমান উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনী পরিবেশকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বৈশাখীপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে নির্বাচনী কার্যালয় খোলেন মাহমুদ হোসেন। সেখান থেকেই তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। বুধবার বিকেলে যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযান চালালে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। অভিযানের সময় নগদ অর্থ উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
হাজী সৈয়দ আহম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকারিয়া মাসুদ বলেন, গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তিনি জানেন না। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। শরীয়তপুর–২ আসনের প্রার্থী মাহমুদ হোসেনের মিডিয়া সেলের প্রধান মাসুদ কবির বলেন, নির্বাচনী এলাকায় ১৩৬টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে এবং এসব কেন্দ্রে তাঁদের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের যাতায়াত ও খাবার বাবদ খরচের জন্য অর্থ কার্যালয়ে রাখা ছিল। প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযান চালিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে অবৈধভাবে অর্থ বিতরণের অভিযোগ থাকলেও সে বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। এ ঘটনায় তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রাতে নড়িয়ায় বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপি প্রার্থী সফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের টাকা দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। ভোটারদের ভয়ভীতি বা অর্থের মাধ্যমে প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুর–২ আসনে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।