প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযান আগের যেকোনো সংঘাতের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চূড়ান্ত নির্দেশ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কয়েক সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক হামলা পরিচালনা করতে সক্ষম। তারা সতর্ক করে বলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা আগের যেকোনো উত্তেজনার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হতে পারে।
কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে এ পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য উসকানিও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এর মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফয় এবং জার্ড ক্রসনারের। ওই বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে চান, তবে সেটি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা জটিল এবং অনিশ্চিত।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও মন্তব্য করেছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইরানে শাসক পরিবর্তনই সম্ভবত সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে শিগগিরই ‘অসাধারণ ক্ষমতা’ দেখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে শাসন পরিবর্তন হলে দেশটি কারা নিয়ন্ত্রণ করবে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘লোকজন আছে।’
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতিও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে পেন্টাগন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রতিরোধমূলক অবস্থান নয়; প্রয়োজনে দ্রুত হামলা চালানোর সক্ষমতা জোরদার করার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমর্থন—এসব ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর। নতুন করে যদি সামরিক অভিযান শুরু হয়, তবে তা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে সামরিক বিকল্পও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এক ধরনের ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থায় রয়েছে—সবাই অপেক্ষায় ট্রাম্পের নির্দেশের।
বিশ্লেষকদের মতে, জেনেভার বৈঠক ব্যর্থ হলে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে। আবার সমঝোতার পথ তৈরি হলে সামরিক প্রস্তুতি কেবল চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নতুন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কূটনীতি ও সামরিক শক্তি একইসঙ্গে প্রাধান্য পাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স