ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো যাকাত। ‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও কল্যাণ। অর্থাৎ যাকাত মানুষের সম্পদকে পবিত্র করে, একই সঙ্গে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও মানবিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর; এর মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা
আত-তাওবা: ১০৩) হাদিসেও যাকাতের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন—
“ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত— আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল— এই সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমজানের রোজা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে হজ পালন করা।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম) আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহ তাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তার যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ বিষধর সাপে পরিণত হয়ে তাকে শাস্তি দেবে।” (সহিহ বুখারি)
এই শিক্ষা আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়— যাকাত শুধু দান নয়; এটি একটি ফরজ ইবাদত এবং একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী সামাজিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থা। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন যাকাত যথাযথভাবে আদায় ও সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা হয়েছে তখন সমাজে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে এমন সময় এসেছিল যখন যাকাত গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আজকের
বিশ্বে দারিদ্র্য ও বৈষম্য একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা বিদ্যমান। কিন্তু ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা যদি পরিকল্পিত, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
পরিচালিত হয়, তাহলে এটি হতে পারে একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো। যাকাতের অর্থ কেবল তাৎক্ষণিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনমুখী কাজে বিনিয়োগ করা হলে দরিদ্র মানুষ আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ পায়।
এই ধারণা থেকেই সমাজের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন যাকাতভিত্তিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ শিবগঞ্জ উপজেলা (বগুড়া) কল্যাণ সমিতি, ঢাকা।
২০১৮
সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত সাত বছর ধরে এই সমিতি যাকাত ফান্ডের অর্থ সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থাপনা করে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সমিতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হলো দারিদ্র্য বিমোচন ও আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি। এর আওতায় প্রতিবছর উপজেলার দুস্থ, অসহায় ও বিধবা নারীদের মাঝে সরকারি খামারের উন্নত জাতের গর্ভবতী ছাগী ও ভেড়া বিতরণ করা হয়। গত সাত বছরে প্রায় দুই শ‘ পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় উপকৃত হয়েছে। এসব প্রাণী থেকে পর্যায়ক্রমে বাচ্চা উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক পরিবার ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। এ ধরনের সফলতার গল্প ইতোমধ্যে সমিতির বার্ষিক স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও
যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে প্রতিবছর ঈদের আগে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। গত সাত বছরে প্রায় দেড় হাজার মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পেয়েছেন এবং আসন্ন ঈদেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সমিতির
সামাজিক কার্যক্রম এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, ওষুধ বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইলচেয়ার প্রদান, দরিদ্র মানুষের জন্য ছোট দোকান স্থাপনে সহায়তা, টিনের ঘর নির্মাণে সহায়তা এবং নগদ অর্থ প্রদানসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শীত মৌসুমে শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিও সমিতির একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
সাম্প্রতিক সময়েও সমিতি বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আহত শিবগঞ্জের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে আর্থিক অনুদান প্রদান এবং আগস্টের ভয়াবহ বন্যার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ত্রাণ সংগ্রহ কার্যক্রম ও সেনাবাহিনী পরিচালিত ত্রাণ তহবিলে সহায়তা প্রদান ছিল উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও সমিতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে— করোনার সুরক্ষা সামগ্রী, ওষুধ বিতরণ, সচেতনতা কার্যক্রম এবং টিকাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
যাকাত
ও অনুদানের অর্থ দিয়ে এই সমিতি উপজেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও সমিতির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। গত বছর উপজেলার প্রায় চার শ‘ এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারীদের সংবর্ধনা, গুণীজন সম্মাননা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো— এই কার্যক্রমগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। যাকাত ফান্ডের পরিধি সীমিত হওয়ায় আরও অনেক দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ এই উদ্যোগ যদি বৃহত্তর পরিসরে পরিচালিত করা যায়, তাহলে আরও অসংখ্য মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে এবং সমাজে দারিদ্র্য হ্রাসে এর প্রভাব আরও সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে।