শরীয়াহ ভিত্তিক দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আইটি ইন্টিগ্রেশনসহ সব ধরনের একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রশাসক ও তাদের সহযোগীদের নিয়ে বৈঠক করেছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
সোমবার (১৬ মার্চ) গভর্নরের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই একীভূতকরণ দ্রুত সম্পন্ন করার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বৈঠকে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক এবং তাদের চারজন করে সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় গভর্নর জানতে চান, ব্যাংকগুলোর আইটি ইন্টিগ্রেশন কেন দেরি হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলোর আলাদা–আলাদা ডেটা একত্রিত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, একীভূতকরণ কার্যক্রম চলমান থাকবে কি না—এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। জবাবে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, সরকার ইতোমধ্যে নতুন এই ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি আমানত বীমা তহবিল থেকে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। ফলে যত দ্রুত সম্ভব পুরো কার্যক্রম শেষ করতে হবে। একীভূতকরণ থেকে পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
এর আগে গত ৩ মার্চ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক করেন গভর্নর। ওই বৈঠকে তিনি জানান, খুব শিগগিরই এই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি প্রশাসকদের নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে যেতে বলা হয়।
গভর্নর আরও নির্দেশ দেন, যেকোনো উপায়ে এসব ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগে পরিচালিত যেসব শিল্পকারখানা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে এসব ব্যাংকের আইটি সিস্টেমসহ সব কার্যক্রম একীভূত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিটি ব্যাংকে একজন প্রশাসক এবং তাকে সহযোগিতার জন্য আরও চারজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা সবাই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। এসব ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বে। অন্য চারটি ব্যাংক পরিচালিত হতো এস আলমের কর্তৃত্বে। ব্যাংক একীভূতকরণ শুরুর পর থেকেই আগের মালিকদের পক্ষ থেকে নানা বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে আমানতকারীদের।
বর্তমানে পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। এসব আমানতকারীর জমা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি ঋণ।
দীর্ঘদিন আমানতের অর্থ তুলতে না পারলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পর গত ১ জানুয়ারি থেকে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ৩০ ডিসেম্বর ঘোষিত বিশেষ স্কিমের আওতায় আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
যাদের দুই লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে, তারা প্রথমে দুই লাখ টাকা পাওয়ার পর প্রতি তিন মাস পরপর এক লাখ টাকা করে সর্বোচ্চ সাত লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। তবে কিডনি ডায়ালাইসিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ তুলতে পারবেন।