ঈদের দিনের অন্যতম সুন্নত হলো ভোরে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা। রমজানজুড়ে সাহরি ও ইবাদতের কারণে অনেকের ঘুমের সময়সূচি ভিন্ন হয়ে যায়। তবে ঈদের দিনে বিশেষভাবে তাড়াতাড়ি জেগে ওঠা, ফজরের নামাজ আদায় করা এবং দিনের প্রস্তুতি নেওয়া সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। ঈদের নামাজের গুরুত্ব বিবেচনায় সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ঈদের দিন গোসল করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব আমল। সাহাবায়ে কেরাম ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। হযরত নাফে (রাহ.) বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা মালেক : ৪৮৮)। গোসলের মাধ্যমে শরীরকে পবিত্র করা এবং পরিচ্ছন্নভাবে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করা ইসলামের সৌন্দর্যের একটি অংশ।
ঈদের দিন মিষ্টি কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়াও সুন্নত। বিশেষ করে খেজুর খাওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ আছে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না এবং তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন। (বুখারি : ৯৫৩)। এর মাধ্যমে রোজা সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয় এবং আনন্দ প্রকাশ পায়।
সদকাতুল ফিতর আদায় করা ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। এটি বিত্তবান মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারকে অশ্লীলতা ও অনর্থক কথা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে। (আবু দাউদ : ১৬০৯)। তাই ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করা উত্তম, যাতে দরিদ্ররা ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে।
ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবির বলা সুন্নত। তাকবির হলো— “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” হযরত নাফে (রাহ.) থেকে বর্ণিত, ইবনে উমর (রা.) ঈদের দিন তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন এবং ইমাম আসা পর্যন্ত তাকবির চালিয়ে যেতেন। (সুনানে দারাকুতনী : ১৭১৬)। এটি ঈদের আনন্দ ও আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করার একটি সুন্দর উপায়।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং ফেরার সময় অন্য পথ দিয়ে আসাও একটি সুন্নত আমল। হযরত জাবের (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) ঈদের দিন এক পথ দিয়ে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতেন। (বুখারি : ৯৮৬)। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বেশি মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ।
ঈদের দিন ঈদ সালামি দেওয়া একটি প্রচলিত সামাজিক রীতি, যা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ। বড়রা ছোটদের ঈদ সালামি দিলে তাদের আনন্দ বেড়ে যায় এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়। এটি ভালোবাসা, স্নেহ ও মমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত।
ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে উৎসাহ দেয়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি ও আয়ু দীর্ঘ হওয়ার আশা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)। তাই ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা, কুশল বিনিময় করা এবং সম্পর্ক দৃঢ় করা উচিত।
এছাড়া ঈদের আনন্দে মগ্ন হয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। একজন মুমিনের জীবনে নামাজের গুরুত্ব সর্বাধিক। ঈদের দিন আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি সময়মতো প্রতিটি নামাজ আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হয়।
সবশেষে বলা যায়, ঈদ কেবল আনন্দের দিন নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য সুযোগ। সুন্নত আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করলে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় এবং জীবনে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত ঈদের দিন এসব আমল যথাসাধ্য পালন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
আাকশজমিন / আরআর