ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ

কাতারে ইরানের হামলা, এলএনজি সংকটে বাংলাদেশ


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৫ মার্চ, ২০২৬ সময় : ৯:৪৯ এএম

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির এলএনজি অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ায় জ্বালানি খাতে বড় চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে সাতটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে কাতার, ফলে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। ইরানের হামলায় এই অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম হঠাৎ করেই ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি কিনতে হবে, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। অন্যদিকে যদি সরবরাহ কমানো হয়, তাহলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প খাতে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

হামলার পর কাতার জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ পুনরায় চালু করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি কাটিয়ে আগের উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ আসে এই রাস লাফান হাব থেকে। ফলে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; চীন, ভারতসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।

কাতার এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, রাস লাফানে থাকা ১৪টি এলএনজি ট্রেনের মধ্যে দুটি এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার ফলে সেখানে বড় ধরনের আগুন লেগে উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। অন্যদিকে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ চেয়েছে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার এবং এডিবি থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বৈদেশিক আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির বড় অংশ আসে কাতার থেকে। সাধারণত মোট এলএনজি আমদানির ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কাতার থেকে সরবরাহ করা হয়। কখনও কখনও এই হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে মোট প্রায় ৬ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার মধ্যে কাতার থেকেই আসে ৩.৬ থেকে ৪.৩ মিলিয়ন টন।

বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে। এর আগে ২০১৭ সালে পেট্রোবাংলা কাতারের সঙ্গে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী কাতার বছরে ১.৮ মিলিয়ন থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহে সম্মত হয়। পরে ২০২৩ সালে কাতারের সঙ্গে আরও একটি চুক্তি হয়, যেখানে বছরে অতিরিক্ত ১.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কাতার ছাড়াও বাংলাদেশ ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করে। ২০১৯ সালে ওমান ট্রেডিংয়ের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী বছরে এক থেকে দেড় মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির কথা রয়েছে। পরে একটি সম্পূরক চুক্তির মাধ্যমে বছরে শূন্য দশমিক ২৫ মিলিয়ন থেকে এক মিলিয়ন টন পর্যন্ত অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ওমান থেকে বাংলাদেশ বছরে সর্বোচ্চ প্রায় তিন মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করতে পারে।

এর বাইরে পেট্রোবাংলা সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কিনে থাকে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর বাংলাদেশ মোট ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৪৫টি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছিল।

কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক সময় চাহিদা ও সরবরাহের সময়সূচি মিলিয়ে দেখা হয়। নির্দিষ্ট সময় চাহিদা থাকলেও যদি কাতার বা ওমান থেকে সরবরাহ পাওয়া না যায়, তখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হয়। আবার অনেক সময় স্পট মার্কেটে দাম তুলনামূলক কম থাকলেও সেখান থেকে কেনা হয়।

তবে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে স্পট মার্কেটে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে সেখানে দামও দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

মার্চ মাসের শুরুতে প্রতি মিলিয়ন বিট্রিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ছিল ১৫ থেকে ১৮ ডলার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর সেই দাম বেড়ে ২০ থেকে ২২ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে তা ৩০ থেকে ৩৫ ডলারে উঠেছে বলে বাজার সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ গড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১৪ ডলারে আমদানি করত। এখন সেই সরবরাহ ব্যাহত হলে স্পট মার্কেট থেকে কিনতে গেলে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হয়, যার বড় একটি অংশ এলএনজি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়। এলএনজির দাম বাড়লে এই ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে কাতার এনার্জি ইতোমধ্যে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অনিবার্য পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ঘোষণা দিতে পারে। এতে সরবরাহ বাধ্যবাধকতা থেকে তারা সাময়িকভাবে অব্যাহতি পায়। ফলে চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, “আমরা আসলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়লাম। কাতারের রাস লাফানের ক্ষতি ঠিক হতে ৫/৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরমধ্যে আমাদের এলএনজি পাওয়া কঠিন হবে। ফলে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে।”

তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে অথবা স্পট মার্কেট থেকে কেনা যেতে পারে। তবে যেভাবেই এলএনজি সংগ্রহ করা হোক না কেন, এতে খরচ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, “ভর্তুকি বাড়াতে না চাইলে গ্যাসের দাম বাড়ানোরও কোনো বিকল্প থাকবে না।”

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, কাতার এনার্জি বাংলাদেশের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। এর ফলে এই সময়ের মধ্যে নির্ধারিত কয়েকটি এলএনজি কার্গো বাতিল করা হয়েছে।

তিনি জানান, গ্রীষ্ম মৌসুমে সেচ ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার কারণে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ে। সেই চাহিদা পূরণ করতে এখন স্পট মার্কেট থেকেই এলএনজি কিনতে হবে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশ।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর