কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের উত্তর ঢাকডহর সরকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম (৩০) সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। পাঁচদিন আগেও তাকে তেমন কেউ চিনতেন না। ফেসবুকে তার ফলোয়ার ছিল মাত্র ছয় হাজারের মতো। তবে একটি মাত্র ভিডিওর কল্যাণে তিনি রাতারাতি দেশের আলোচনায় চলে আসেন।
রোববার (২৯ মার্চ) রাতেও তাইজুল ইসলামের ফলোয়ার ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। সোমবার (৩০ মার্চ) রাত সোয়া ৭টায় তার পেজে গিয়ে দেখা যায়, ফলোয়ার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ হাজারে। রাত সোয়া ৯টায় তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ ৭ হাজারে পৌঁছে। বর্তমানে হয়তো আরও বেড়ে গেছে।
তাইজুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তাজু ভাই ২.০’ নামেই পরিচিত। তার ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছে। ভিডিওটিতে তিনি স্থানীয় নারায়ণপুর বাজারে জিলাপি বিক্রির বিষয়ে সাধারণ গ্রাম্য ভাষায় দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? সাদাডা কত, লালডা কত?” এই সরল ও স্বাভাবিক উপস্থাপনার কারণে ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওটি ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের প্রেক্ষিতে নির্মিত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, তাজু ভাই স্থানীয় একটি দোকানে গিয়ে জিলাপি বিক্রির বিষয়ে দোকানিকে প্রশ্ন করছেন এবং সাধারণ মানুষের কৌতূহল মিটিয়ে দেন। তিনি বলেন, “অনেক এখানে দোকানপাট, অনেক জিলাপি ভাজতেছে। তার কাছে আমি প্রশ্ন করবো—জিলাপি কত করে বিক্রি করছেন? সাদাডা কত, লালডা কত?” এরপর সরাসরি তিনি প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? যদি জনগণকে বলতেন তাহলে অনেক খুশি হইতাম।”
তাজু ভাইরাল হওয়ার আগে ভিডিও নির্মাণের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। পেশায় তিনি রাজমিস্ত্রির সহকারী (হেলপার)। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কাজের ফাঁকে শখের বশে ভিডিও নির্মাণ করেন। তিনি বলেন, “আমার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই আমি ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক নই। আপনারা সাংবাদিকরা নারায়ণপুরে আসেন না, আমাদের এলাকার খবর করেন না—তাই আমি নিজেই ভিডিও করি। আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। আমাকে ট্রোল করলেও আমার কষ্ট নেই। আমি শুধু চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক।”
তাইজুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া ভিডিও ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদল তার সরলতার প্রশংসা করেছেন, আবার অন্যদল তাকে ট্রোল বা ব্যঙ্গ করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তাইজুল ইসলাম নাগেশ্বরী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত নারায়ণপুর ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলামের ছেলে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। অভাব-অনটনের কারণে তিনি কখনো স্কুলের বারান্দায় পা রাখেননি।
নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “ওই ছেলের বাড়ি আমার পরিষদের সামনেই। তবে সে যে ভিডিও করে ভাইরাল হয়েছে, তা আজই প্রথম শুনলাম।” স্থানীয়রা বলেন, তাইজুল ইসলামের সরলতা এবং গ্রাম্য ভাষায় উপস্থাপনা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। তার ভিডিওতে গ্রামের সাধারণ জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ফলোয়ারের সংখ্যা হুহু করে বৃদ্ধি পায়। ভিডিও শেয়ার ও কমেন্টের মাধ্যমে মানুষ তার কৌতূহল, মজাদার উপস্থাপনা ও সরল মনোভাবকে সমর্থন জানিয়েছেন।
তাইজুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া ভিডিও শুধু মজা বা বিনোদন নয়, এটি স্থানীয় জীবনের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। তার প্রশ্ন ও উপস্থাপনায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দিকটি ফুটে উঠেছে। এই সরলতা এবং স্বাভাবিকতা মানুষকে আকৃষ্ট করছে এবং তার ফলোয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তাজু ভাইরাল হওয়ায় বিভিন্ন প্রাইভেট ও পাবলিক প্রতিষ্ঠান তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও শেয়ার এবং ফলোয়ারের বৃদ্ধিতে দেখা যাচ্ছে যে, ছোট গ্রামীণ জনপদ থেকেও দেশের মানুষকে আকর্ষণ করা সম্ভব।
তাজু ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণও সচেতন হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি রেটে জিলাপি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ জানতে পারছে। এই ভিডিও গ্রাম্য জীবনের সরলতা এবং স্থানীয় বাজারের অবস্থা তুলে ধরেছে।
ভিডিও তৈরির সময় তাইজুল ইসলাম তার ব্যস্ততা, পেশা এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, “আমি চাই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ও আনন্দময় মুহূর্ত তুলে ধরা হোক। ভিডিওটি আমার পরিবারের জন্যও উৎসাহ হিসেবে কাজ করছে।”
তাজু ভাইরাল হওয়ায় তার ফলোয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে যা তার সামাজিক প্রভাবকেও তুলে ধরে। তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। সারসংক্ষেপে, তাইজুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া ভিডিও গ্রামীণ জীবনের সরলতা, সামাজিক সচেতনতা এবং জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি সহ এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।