মানবপাচার প্রতিরোধে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহআমানত বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাচারকারী চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক সংস্থা চতুর্মুখী তৎপরতা শুরু করেছে। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানবপাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে দায়ীদের আইনের আওতায় আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ২১ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে মানবপাচার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনার পর থেকেই বিমানবন্দরকে ঘিরে নজরদারি ও তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানিয়েছেন, মানবপাচার প্রতিরোধে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে কারা মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন মহলে এ ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি তদন্ত করছে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভ্রমণ ভিসার আড়ালে বিমানবন্দর ব্যবহার করে মানবপাচার করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তারা তরুণদের ফাঁদে ফেলে বিদেশে পাঠায়। অনেক ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনা করে পাচারকারীরা এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
এভাবে বিদেশে পাঠানোর পর অনেক তরুণকে বিপজ্জনক পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। পথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবারকে মুক্তিপণ দিতেও বাধ্য করা হয়। কেউ কেউ মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারলেও অধিকাংশই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের পরিবারও চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যায়।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরে কর্মরত কয়েকটি সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তা পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত। বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে যাত্রীদের বিমানবন্দর পার করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এজন্য প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়েছে।
মানবপাচারের এই প্রক্রিয়ায় বিমানবন্দরের ধাপটি শেষ ধাপ হওয়ায় ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় জানতেই পারেন না। ফলে মামলার সময় তাদের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয় না এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনার পর সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিশেষ করে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম সংশ্লিষ্টদের মানবপাচার রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার পর বিমানবন্দরে কর্মরত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আরও সক্রিয় হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকার শাহজালাল এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরকে ঘিরে এক ধরনের গোয়েন্দা জাল বিস্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের চলাচল ও কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, বিশেষ করে ভ্রমণ ভিসার আড়ালে মানবপাচার বন্ধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবপাচার প্রতিরোধে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অবস্থান অনেক বেশি কঠোর।