ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

আইসিইউ সংকটে রাজশাহী মেডিকেলে এক মাসে ৯১ শিশুর মৃত্যু


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৮:৫৩ পিএম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যাসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে আইসিইউর অপেক্ষায় থেকে গত এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯১ জনই শিশু, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, এই সংকট নিরসনে ১০০ শয্যার একটি নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা মাত্র ৪০টি। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২টি, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য ১৬টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২টি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে। তবে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য বিভাগ থেকে শয্যা কমিয়ে শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে শিশু আইসিইউতে ভর্তি ছিল ১১৯ জন। একই সময়ে আইসিইউতে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ শিশু। তাদের মধ্যে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছে ৯১ শিশু। একই সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ ছিলেন ৩০২ জন। এদের মধ্যে ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন ৩১২ জন। তাদের মধ্যে ৬৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে জটিলতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আইসিইউর চাহিদা হঠাৎ করেই কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।

হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে এবং শিশু আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ১৮টি শয্যার মধ্যে ১২টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে হামের উপসর্গে মোট ৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে ১২৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

আইসিইউ সংকটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে রোগীর স্বজনদের অভিজ্ঞতায়। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা রিফাত তাঁর পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন। আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় তাঁর মেয়ের সিরিয়াল ছিল ৩২ নম্বরে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও আইসিইউ না পেয়ে গত ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় তাঁর মেয়ের মৃত্যু হয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আইসিইউতে একটু জায়গার জন্য কতজনের কাছে গেছি, হাত–পা ধরেছি। কিন্তু আমার মেয়ের জন্য একটা বেড জোটেনি।’ একইভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯ মাস বয়সী একটি শিশু ৩১ নম্বর সিরিয়ালে থেকে ২৬ মার্চ মারা যায়। একই দিনে ৩০ নম্বর সিরিয়ালে থাকা আরেক শিশু হুমায়রারও মৃত্যু হয়।

এই ঘটনাগুলো হাসপাতালের বর্তমান সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। চিকিৎসকরা বলছেন, পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না, যার ফলে মৃত্যুহার বাড়ছে।

১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ২০১৩ সালে ১ হাজার ২০০–তে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী এখানে ভর্তি থাকেন। ফলে হাসপাতালের ওপর স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি চাপ তৈরি হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে আশপাশের এলাকায় শিশু আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ গুরুতর শিশু রোগী এই হাসপাতালে আসে। এতে করে আইসিইউ শয্যার চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি শিশু আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হয়। তবে গত মার্চ মাসে হঠাৎ করে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই চাহিদা বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০টিতে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো এবং বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ সংকট দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে করে রোগীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর