ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

গভীর সংকটে অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ-সবখানেই সংকটের ছায়া


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৪:০২ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক বড় চাপের মুখে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ব্যাংক খাতের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই বৈদেশিক খাতে নতুন ঝুঁকি যোগ হয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা। ফলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একসঙ্গে চলা একাধিক সমস্যার মধ্যে কোনটিকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কার, নাকি জ্বালানি খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা—এই চারটি ক্ষেত্রই এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

টানা কয়েক বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা কমে গেছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও কিছু প্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবস্থার কারণে সরকারকে সহায়তা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতি চাঙা করার জন্য বড় ধরনের রাজস্ব সহায়তা দেওয়ার সুযোগও কমে গেছে। প্রবাসী আয়ের কারণে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও রপ্তানি খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ওপর নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি টাকার ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং মূল্যস্ফীতিকে আবারও উসকে দিতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে, চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে এবং ভর্তুকি ব্যয়ের চাপও বাড়বে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার তার চেয়ে কম। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অর্থনীতি পরিচালনায় সরকার এক ধরনের দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বাড়াতে হয়, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ সরবরাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

প্রবৃদ্ধির দিকেও অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি খুব কম হারে বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে না গিয়ে আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

দারিদ্র্য পরিস্থিতিও আবার আলোচনায় এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয় কমে যাওয়ার কারণে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ কোটি কোটি মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। প্রবৃদ্ধি থাকলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

দেশে আয়বৈষম্যও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট আয়ের বড় অংশ এখন অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় সংকুচিত হচ্ছে, যা ভোক্তা চাহিদাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। অর্থনীতির সামগ্রিক গতি কমে যাওয়ার এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। গত কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি হয়নি। নতুন কর্মসংস্থানের বড় অংশ কৃষি খাতে সীমাবদ্ধ, যা তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদনশীল। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বরং কমেছে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

নারীদের কর্মসংস্থানেও সংকট দেখা দিয়েছে। শহরে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমেছে এবং অনেক নারী এখন কম বেতনের অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। শিক্ষিত তরুণীদের একটি বড় অংশ বেকার থাকছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই উদ্বেগের বিষয়।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত দুর্বল। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, যা বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করেছে।

অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি এখন ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থপাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নেতৃত্বের ওপর এখন বড় চাপ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদহার নির্ধারণ, ব্যাংক সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা—সবই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের রাজস্ব ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে সরকার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থনীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি খাত। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়বে, আবার দাম সমন্বয় করলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন এক জটিল ভারসাম্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংক খাত ও জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি একত্রে অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

ঢাকা টুডে / আরজে


এ সম্পর্কিত আরো খবর