ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি

দুদকের মামলায় থমকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ১:০৩ পিএম

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি বর্তমানে অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শতাধিক মামলার জটিলতায় সম্ভাবনাময় এই বাজারটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মালয়েশিয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেলেও মামলাজটের কারণে সেটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এসব মামলার নিষ্পত্তি না হলে দেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বৈঠকে মালয়েশিয়া পক্ষ স্পষ্টভাবে জানায়, চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তি ছাড়া শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। তারা আরও জানায়, যেসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে, সেগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ, জবাবদিহি এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে মালয়েশিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাস্তব অগ্রগতি না হলে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবে না।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। বন্ধের আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। এসব শ্রমিক মূলত নির্মাণ, বনায়ন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কাজ করে থাকেন। ফলে এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর একটি ওভারসিজ প্রতিষ্ঠানের মালিক ব্যবসায়ী আলতাফ খান ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মানব পাচার ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, মামলাটি গ্রহণে সে সময় বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগগুলো চূড়ান্তভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ১৫ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়।

তবে বাদী আলতাফ হোসেন এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেন। এর পর মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে।

এরই মধ্যে একই ধরনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করে। যদিও মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন নিজস্ব তদন্তে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে মানব পাচার বা অর্থ পাচারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দিয়ে মামলাগুলোকে অসত্য উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। চিঠিতে দুই দেশের স্বার্থে দ্রুত সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে জানায়, অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় মামলাগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং দ্রুত কর্মী পাঠানো পুনরায় শুরু করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে মামলাগুলো প্রত্যাহার না হয়ে বরং নতুন করে মামলা দায়েরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দেশের মধ্যে শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। পুত্রজায়ার বৈঠকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়, যেখানে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—একটি ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা চালু করা, যা সব সোর্স কান্ট্রির জন্য প্রযোজ্য হবে।

এই নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নিয়োগকর্তারা যাতে শ্রমিক নিয়োগের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেন, সেটি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে করে শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং প্রতারণার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যতদিন পর্যন্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। কারণ মালয়েশিয়া পক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে, আইনি জটিলতা নিরসনই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রধান শর্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তার মধ্যে মালয়েশিয়া একটি স্থিতিশীল বিকল্প হতে পারত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলাজটের কারণে সেই সম্ভাবনা এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তারা আরও বলেন, দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর