ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

চট্টগ্রামে ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগ


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ১২:৪৩ পিএম

চট্টগ্রামে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, যা নগর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময় এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) চট্টগ্রাম বিতরণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও বর্তমানে ১০টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যেখানে এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬শ মেগাওয়াটের বেশি, সেখানে বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।

২০ এপ্রিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অফ-পিক আওয়ারে উৎপাদন ছিল ২ হাজার ১৫২ দশমিক ৭০ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ২ হাজার ৩৪৯ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট। অথচ এই সময়েই বিদ্যুতের চাহিদা সর্বাধিক থাকে। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার এই বড় ব্যবধান থেকেই তৈরি হচ্ছে লোডশেডিং।

বিউবো সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়কে পিক আওয়ার ধরা হয়, যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। আর রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় অফ-পিক আওয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে পিক আওয়ারেই লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার বলেন, গত কয়েকদিন ধরে দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে দিনে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, পরীক্ষার সময় লোডশেডিং বন্ধ রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারণ, এই সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে কিছু কেন্দ্র আংশিকভাবে চালু থাকলেও অনেকগুলো কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। যেমন—৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বারাকা বিদ্যুৎকেন্দ্র সকালে বন্ধ থাকলেও রাতে চালু ছিল। দোহাজারির ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি সকালে বন্ধ থাকলেও রাতে চালু হয়ে মাত্র ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।

বেসরকারি খাতের জুডিয়াক, জুলদা-২ এবং জুলদা-৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও কোনো উৎপাদন হচ্ছে না। অন্যদিকে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ২টি চালু রয়েছে। ওই দুটি ইউনিট থেকে দিনে ৭০ মেগাওয়াট এবং রাতে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এখানে ৪২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ২১০ মেগাওয়াট হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না।

রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, একটি ইউনিট এক বছরের বেশি সময় ধরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে এবং অন্যটি গ্যাস সংকটের কারণে চালু করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে অন্তত ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

গ্যাস সরবরাহ নিয়েও রয়েছে জটিলতা। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আমিনুর রহমান জানান, বর্তমানে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ৩৭ থেকে ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে কিছুদিন রাউজানে গ্যাস দেওয়া হলেও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা আবার শিকলবাহায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান মিলিয়ে গঠিত বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৩শ থেকে ১ হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বিউবোর সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন জানান, ২০ এপ্রিল অফ-পিক আওয়ারে ৬৭ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ১০৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এই ঘাটতিই মূলত লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ।

এদিকে আবহাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে এবং আগামী দিনগুলোতে তা আরও বাড়তে পারে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, গ্যাস সংকট, উৎপাদন ঘাটতি এবং বাড়তি চাহিদার কারণে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর