মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছে, যেখানে একদিকে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো বলছে, এটি শুধু স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যে একটি স্থায়ী চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানির গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন করে সংকট সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
রপ্তানি খাতে দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। বিশেষ করে মার্চ মাসে বড় ধস নেমেছে, যেখানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই পতনের পেছনে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের দুর্বল পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি রপ্তানি খাতগুলোও একই ধরনের সংকটে পড়েছে।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই এই আমদানি ব্যয়ের মূল কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ফলে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বর্তমান সংকটটি শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক প্রভাবের ফল। তিনি বলেন, “সামগ্রিক অর্থনীতি একটা চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সুদের হার বৃদ্ধিও আমদানি-রপ্তানিতে সমস্যা তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রপ্তানি খাতে আগে থেকেই নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল, যা মার্চে এসে আরও তীব্র হয়েছে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার মতে, সরকারকে জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প রুট খুঁজতে হবে এবং একই সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়ী হতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনে বাজেট বড় হলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়বে। তাই বাজেট প্রণয়নে সতর্কতা অবলম্বন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হারকে নমনীয় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে এই চাপের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। এপ্রিলের প্রথম আট দিনেই এসেছে প্রায় ৯৭৫ মিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ফেব্রুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় কম। একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবেও উন্নতি হয়েছে এবং উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার।
সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আপাতত কিছুটা স্থিতিশীলতা রয়েছে। বর্তমানে মোট রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার এবং ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। রপ্তানি খাতের দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বাড়বে। এতে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদরা রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। এখনই কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।