যশোরের কেশবপুরে বোরো মৌসুমে দেখা দিয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী শ্রমবাজার পরিস্থিতি। এখানে শ্রমিকের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে দেড় মণ ধানের সমমূল্যে মিলছে একজন কৃষি শ্রমিক। স্থানীয়ভাবে এটিকে বলা হচ্ছে ‘শ্রমিকের হাট’, যা এখন কৃষকদের জন্য বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ভোরে কেশবপুর উপজেলার মূলগ্রাম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই শত শত কৃষি শ্রমিক কাঁচি, দা ও বাখ-দড়ি নিয়ে হাটে জড়ো হয়েছেন। তারা ধান কাটা, ধান বাঁধা, বাখে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, ঝাড়াই এবং বিচালী গাদা দেওয়ার মতো বিভিন্ন কাজে নিজেদের শ্রম বিক্রি করছেন।
শ্রম বিক্রি করতে আসা দোরমুটিয়া গ্রামের আব্দুল রহিম জানান, তিনি সকাল ৬টার দিকে কাজের সন্ধানে হাটে আসেন। বর্তমানে বাখে করে ধান বহনের জন্য তিনি ১ হাজার ৬০০ টাকা মজুরি দাবি করছেন। অথচ একই কাজ আগে ৫০০ টাকায় করা যেত।
শ্রমিক কেনার জন্য আসা আলাউদ্দিন বলেন, তিনি এক বিঘা জমির ধান কেটে বিচালী বেঁধে আনার জন্য ২০ জন শ্রমিক নিয়েছেন। প্রতি শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার ৪০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। তারা সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করবেন।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রায় ১৫ বছর ধরে এ ধরনের শ্রমিক হাটে দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিকরা আসেন। তবে এবার শ্রমিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ধান চাষি ফজলু জানান, একদিন বা এক সপ্তাহের জন্য এখানে শ্রমিক ‘কেনা’ হয়। বর্তমানে একজন শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগেও ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় শ্রমিক নেওয়া হয়েছে।
আরেক কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, ধানের বাজারমূল্য কম হলেও শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ মোটা ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। অন্যদিকে একজন শ্রমিকের মজুরি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। এতে কৃষকেরা চরম আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছেন।
কেশবপুর উপজেলা আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন জানান, বর্তমানে মোটা ধান প্রতি মণ ১ হাজার টাকা এবং চিকন ধান ১ হাজার ৮০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি সেই তুলনায় অনেক বেশি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এ বছর কেশবপুরে বোরো ধান ১৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে মৌসুমে মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি জানান।
কৃষক ও শ্রমিকদের এই বিপরীত পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। একদিকে ধানের দাম কম, অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকেরা উৎপাদন খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত সমাধান না হলে আগামী মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।