ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ধান চাষ করে ফকির হয়ে যাচ্ছি: কিশোরগঞ্জে কৃষকের আর্তনাদ


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৪:০৭ পিএম

কিশোরগঞ্জ ব্যুরো 

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকরা। কয়েক দিন আগেও মাঠজুড়ে পাকা ধানের সোনালি আভা আর দুলে ওঠা শীষে ভরে ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এখন চারদিকে শুধু পানির নিচে ডুবে থাকা ধানক্ষেত, আর কৃষকের হতাশা ও কান্না।

রবিবার, সোমবার ও মঙ্গলবার টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার হাওরাঞ্চলে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কৃষকদের চোখের সামনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর ঋণের টাকায় ফলানো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যে সময়টায় ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠার আনন্দে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কৃষকরা বলছেন, প্রকৃতির এমন আচরণ তাদের সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দিয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৮৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর এবং সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের হাওরগুলোতে অন্তত দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান পানির নিচে রয়েছে। এসব এলাকায় ধান কাটার আগেই পানি ঢুকে পড়ায় কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মিঠামইন উপজেলার বৈরাটি ও ঢাকী ইউনিয়ন এবং ইটনা উপজেলার ধনপুর, চৌগাঙ্গা ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দ্রুত না কমলে ধান কাটা সম্ভব হবে না। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ধানগাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলে দ্রুত পচন ধরবে এবং ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল ইসলাম খান অপু বলেন, “অতি বর্ষণের কারণে নিম্নাঞ্চলের জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।”

অন্যদিকে, শুধু খেতের ধানই নয়, আগেই কেটে রাখা ধানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। সোমবার রাতে অতিবৃষ্টির কারণে মাঠে শুকাতে দেওয়া কয়েকশ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, নদী ভরাট হয়ে যাওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণেই প্রতি বছর এমন জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। খোয়াই নদীর পানি লাখাই হয়ে কালনী নদীতে যাওয়ার কথা থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে কালনী নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে উজানের পানি হাওরে জমে থেকে ধানের ক্ষতি করছে।

করিমগঞ্জের জয়কা গ্রামের কৃষক ওসমান গনি বলেন, “ধান ভালো হইলেও লাভ নাই। এক মণ ধান বেচলেও শ্রমিকের মজুরি ওঠে না। এখন ১১০০ টাকায় শ্রমিক আনতে হয়, কিন্তু বাজারে ধানের দাম ৭০০-৮০০ টাকা। এভাবে চললে আমরা বাঁচবো কিভাবে?”

নিকলী উপজেলার মজলিসপুর হাওরের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, “এবার ধান চাষে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কম। এক মণ ধান ফলাতে ১১০০ টাকার মতো খরচ, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকায়। এতে আমরা বড় লোকসানে পড়েছি।”

একই এলাকার কৃষক আব্দুল মতিন জানান, এক একর জমিতে ধান চাষ থেকে কাটা পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করে সেই খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “এভাবে চললে পরিবার নিয়ে বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে।”

পাইকারি ব্যবসায়ী পারভেজ মিয়া জানান, বড় ব্যবসায়ীরা ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারে দাম কমে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা সামান্য লাভে ধান কিনি, কিন্তু মূল ক্রেতারা দাম না দিলে আমাদের কিছু করার থাকে না।”

করিমগঞ্জের চংনোয়াগাও হাওরের কৃষক মো. আলাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগামী বছর আর ধান চাষ করবো না। জমি পতিত থাকলেও রাখবো। ধান চাষ করে ফকির হয়ে যাচ্ছি।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, “এ বছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা বিষয়টি উচ্চমহলে জানাবো এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো।”

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে অনেক কৃষক মাঠে নামতে পারছেন না। দ্রুত পানি নেমে গেলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারমূল্যের অস্থিরতায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর