খুলনার দাকোপ উপজেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, জেল-জরিমানা এবং জাল জব্দের পরও জীবিকার তাগিদে জেলেরা ঝুঁকি নিয়ে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। গত তিন মাসে প্রায় ৬ লক্ষ মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।
সরেজমিনে পশুর ও ঢাংমারী নদীসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিন-রাত নির্বিশেষে চলছে রেণু আহরণ। বিশেষ করে বাণীশান্তা, ঢাংমারী, ঝালবুনিয়া, সুতারখালী ও কালাবগী এলাকায় শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুকে নিষিদ্ধ নেট জাল দিয়ে রেণু সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। একটি চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে জালে আটকা পড়া অসংখ্য দেশি মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ডাঙায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, জীবিকার তাগিদেই তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। তাদের ভাষায়, নদীতে নামলে কুমিরের ভয়, আর পাড়ে উঠলে প্রশাসনের ধাওয়া। তবুও অভাবের কারণে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ১ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পারলে প্রায় ৭০০ টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে। তারা স্বীকার করেন, এটি আইনবিরোধী হলেও বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় তারা এই কাজ ছাড়তে পারছেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা সংগৃহীত রেণু সরাসরি বাজারে বিক্রি না করে কিছু ফড়িয়া বা অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে তুলে দেন। এসব ফড়িয়া গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রেণু সংগ্রহ করে পরে ড্রামভর্তি করে বিভিন্ন ঘের বা বড় আড়তে সরবরাহ করে থাকেন। ফলে একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যা এই অবৈধ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছে।
দাকোপ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবুবকর সিদ্দিক জানান, নিষিদ্ধ নেট জাল ব্যবহার করে রেণু আহরণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জব্দ করা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গত তিন মাসে উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ উদ্যোগে ১৬টি মোবাইল কোর্ট ও ৬৩টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৬.১৭ লক্ষ মিটার অবৈধ কারেন্ট ও নেট জাল জব্দ করা হয়েছে। তবে জেলেরা অনেক সময় গভীর রাতে রেণু আহরণ করায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য জেলেদের সচেতনতার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, এই সমস্যার মূল সমাধান নির্ভর করছে দুইটি বিষয়ের ওপর—একদিকে ফড়িয়া ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং অন্যদিকে প্রান্তিক জেলেদের জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা। তা না হলে দাকোপের নদ-নদীগুলো অচিরেই মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।