ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ

ঢালাও মামলায় বিপাকে সাংবাদিক সমাজ


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৩ মে, ২০২৬ সময় : ৩:৪০ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটি বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দী রয়েছেন একাধিক সাংবাদিক। বারবার জামিন আবেদন করেও তারা মুক্তি পাচ্ছেন না। আবার অনেকেই মামলার ভয়ে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে জামিন পাওয়ার নতুন আশা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ২১ আগস্ট একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে আটক করা হয়। তারা স্বামী-স্ত্রী। বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে গেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাদের আটক করে। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় উত্তরা এলাকায় ফজলুল করিম হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একইভাবে আদাবরে পোশাকশ্রমিক রুবেল হত্যা মামলাতেও তাদের আসামি করা হয়। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে থাকলেও এখনো জামিন পাননি।

একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত। তাদের বিরুদ্ধেও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময়ের একাধিক হত্যা মামলায় অভিযোগ আনা হয়। এরপর থেকে তারা কারাগারে রয়েছেন এবং তাদের জামিন আবেদন একাধিকবার নাকচ হয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হন জাতীয় প্রেসক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ। তিনিও এখনো কারাগারে আছেন। একই সময়ে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকেও একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এসব মামলা সরকার দায়ের করেনি, বরং সাধারণ মানুষ করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—গ্রেপ্তার, জামিন না হওয়া এবং দীর্ঘ কারাবাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ কতটুকু। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা বা দীর্ঘদিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে সমাধান আসবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সময়ে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে।

ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। যেমন—একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন, যিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বঙ্গভবনের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাকেও একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, একই সময়ে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। এই ধরনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতিও দেখা গেছে। যেমন—জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০২৬ সালের মার্চে জামিন পেয়েছেন। এছাড়া শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন ও মঞ্জুরুল আলম (পান্না) জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তাদের অব্যাহতি দিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, এসব সংবেদনশীল মামলায় যথাযথ তদন্ত চলছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, আর প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সাংবাদিকদের অনেকেই মনে করছেন, সাংবাদিকতা পেশা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু তাই বলে ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে সাংবাদিকদের আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’। কিন্তু বাস্তবে দেশের গণমাধ্যম এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিন দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। সচিবালয়ে প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে কিছু শিথিলতা এলেও নতুন নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণমাধ্যম চাপের মধ্যে ছিল। সেই সরকারের পতনের পর স্বাধীনভাবে কাজ করার আশা তৈরি হলেও বাস্তবে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরাসরি চাপ কম থাকলেও ‘মব’ বা দলবদ্ধ সহিংসতার ভয় সাংবাদিকদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

সব মিলিয়ে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্র মিশ্র বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।



এ সম্পর্কিত আরো খবর