মো. আনোয়ার হোসাইন জুয়েল, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল তাড়াইল উপজেলায় অতি ভারী বৃষ্টির কারণে বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ৪ হাজার ৬৪৪ জন কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে বলে জানা গেছে। এক সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও নদ-নালা, খাল-বিলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলি জমিগুলো পানিতে ডুবে যায়। এতে কৃষকের পরিশ্রম ও ঋণে চাষ করা বোরো ধান সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাড়াইল উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়ন হাওর এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলে কৃষির ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব বেশি পড়ে। ধলা, জাওয়ার, দামিহা, দিগদাইড় ও তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা যায়, আবাদকৃত অধিকাংশ বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ধানের শীষ পানির ওপর ভেসে থাকলেও তা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, তারা ঋণ নিয়ে ফসল আবাদ করেছিলেন। ফসল বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধের আশা ছিল। কিন্তু এখন সব শেষ হয়ে গেছে। অনেক কৃষক পরিবারে খাদ্য সংকট ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বলে জানান। অনেকে বলেন, কৃষি ছাড়া তাদের অন্য কোনো আয় নেই, ফলে এই ক্ষতি তাদের জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
জাওয়ার ইউনিয়নের বোরগাঁও গ্রামের কৃষক আলী ওসমান বলেন, “আমার ২০০ শতাংশ জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলাম, ভেবেছিলাম ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। কিন্তু এখন রক্ত বিক্রি করেও সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব না।”
অন্য কৃষক আলিম উদ্দিন ও মহর উদ্দিন বলেন, কৃষিই তাদের একমাত্র পেশা। ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা এখন পরিবার চালানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন। সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার চালানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলেও জানান তারা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই হাওর এলাকায় এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ক্ষতির তুলনায় সরকারি সহায়তা খুবই সীমিত থাকে। ফলে তারা বারবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর তাড়াইল উপজেলায় বোরো ধানের আবাদি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৪২০ হেক্টর। অতি ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ৪ হাজার ৬৪৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার বিকাশ রায় বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, “যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রণোদনা বা সহায়তা আসে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন।”
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর এলাকায় আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ফসল রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়।