গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মা ও মেয়েসহ পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় ফরেনসিক প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ ও লোমহর্ষক তথ্য। ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে এবং দেড় বছর বয়সী এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার (১১ মে) বিকেলে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক মাজহারুল হক গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
গত শনিবার সকালে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বাড়ি থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। নিহতরা হলেন—গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩০), তার নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (দেড় বছর) এবং রসুল মোল্লা (২৩)।
তারা সবাই কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী মজিবুর রহমানের বাসায় ভাড়ায় বসবাস করতেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লা (৪০), গোপালগঞ্জ সদরের গোপীনাথপুর গ্রামের আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে। তিনি পেশায় প্রাইভেটকার চালক ছিলেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালাচ্ছে।
ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক মাজহারুল হক জানান, ময়নাতদন্তে দেখা গেছে শারমিন খানম, তার ছেলে রসুল মোল্লা এবং দুই শিশু মীম ও হাবিবাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। আর দেড় বছর বয়সী শিশু ফারিয়াকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত নৃশংসভাবে সংঘটিত হয়েছে। প্রতিটি মরদেহে সহিংসতার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি যে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।”
চিকিৎসক আরও জানান, নিহতদের শরীরে কোনো ধরনের নেশাজাতীয় বা চেতনানাশক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে তাদের পাকস্থলীর নমুনা এবং অন্যান্য জৈব উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ঘটনার তদন্তে থাকা গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতেই নিহত শারমিন খানমের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ফোরকান মোল্লার নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ফোরকান মোল্লাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে একটি লিখিত নোট পাওয়া যায়, যেখানে ফোরকান মোল্লা তার স্ত্রী শারমিনের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ এবং শ্যালকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে ধরেন বলে জানা যায়। তবে এই নোটের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গোপালগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ জানিয়েছেন, নিহতদের পাশে পাওয়া অভিযোগপত্র বা জিডির কোনো অস্তিত্ব থানার রেকর্ডে নেই। তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো জিডি আমাদের থানায় হয়নি। ফলে নথিটির সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মধ্যে এ ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকায় আগে কখনো ঘটেনি। বিশেষ করে একসঙ্গে পাঁচজনের মৃত্যু পুরো এলাকা শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।
পুলিশ বলছে, এটি একটি পারিবারিক বিরোধ থেকে উদ্ভূত জটিল হত্যাকাণ্ড হতে পারে, তবে সবকিছুই তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফরেনসিক ও সিআইডির প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যার প্রকৃত কারণ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা মিলবে।
এ ঘটনায় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।