কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া গ্রামে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও অস্কারজয়ী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়ির প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। বাংলা সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও গ্রামীণ জনজীবনের অন্যতম প্রাণের এই মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
বুধবার (১৩ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ মেলা তিন দিনের জন্য আয়োজন করা হলেও এর আমেজ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় সপ্তাহজুড়ে চলবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। মঙ্গলবার সকাল থেকেই মেলার মাঠে মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা দোকান সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, আবার কোথাও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বেচাকেনা।
মসূয়া গ্রামের ঐতিহাসিক রায় বাড়ির সামনের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সারি সারি দোকান বসেছে। মাটির পুতুল, হাড়ি-পাতিল, খেলনা, তৈজসপত্র, কাঠের সামগ্রী, কসমেটিকসসহ নানা পণ্যে ভরে উঠেছে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, চরকি ও বিভিন্ন ধরনের রাইড যুক্ত হওয়ায় মেলার আকর্ষণ আরও বেড়েছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী আশপাশের জমিতেও দোকান বসিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবার মেলার ইজারা থেকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা গত বছরের ৭১ হাজার ৭০০ টাকার তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৫৫ গুণ বেশি। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক রেস্টহাউস ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময় থেকে শ্রী শ্রী কাল ভৈরবী পূজাকে কেন্দ্র করে এ বৈশাখী মেলার সূচনা হয়। স্থানীয়দের কাছে ‘রায় বাড়ি’ নামে পরিচিত এই বাড়িটিই ছিল বিশ্বনন্দিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিবারের আবাসস্থল। এখানে ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী এবং ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়। পরবর্তীতে দেশ বিভাগের আগেই পরিবারটি কলকাতায় চলে যায়। উত্তরাধিকারী না থাকায় বর্তমানে বাড়িটি সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
সম্প্রতি রায় বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্থাপনা ও পুকুরঘাট সংস্কার করায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি। সংস্কারের পর শুধু মেলা উপলক্ষে নয়, সারা বছরই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে রায় বাড়ি। স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন বলেন, “এটি শুধু একটি মেলা নয়, কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। তাই এবারের আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কমিটির মাধ্যমে মেলা পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জনজীবনের মেলবন্ধনে কটিয়াদীর মসূয়ার এই বৈশাখী মেলা এখন শুধু একটি স্থানীয় আয়োজন নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, এ মেলা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করবে।