স্টাফ রিপোর্টার
নিজের সারাজীবনের সঞ্চয়, পেনশনের টাকা কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই বা জমি কিনতে চান দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের শেষ ধাপে এসে যখন তারা পা রাখেন দেশের কোনো সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে, তখনই মুখোমুখি হতে হয় এক নির্মম বাস্তবতার। আইনগতভাবে সম্পত্তির মালিকানা নিরাপদ করার এই প্রধান কেন্দ্রগুলো আজ সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। 'ঘুষ ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি হয় না'—এই অলিখিত নিয়মটিই যেন এখন এ দেশের ভূমি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেই গড়ে উঠেছে এক অভেদ্য দুর্নীতির সিন্ডিকেট। যেখানে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না, আর নিয়ম মেনে কাজ করতে গেলে পদে পদে জুটলে হয়রানি।
দুর্নীতির অদৃশ্য কাঠামো: যেভাবে খাটে 'কমিশন'
সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী এতটাই নিখুঁত যে, সাধারণ চোখে সরাসরি কোনো অপরাধ ধরা কঠিন।
ক. প্রতিনিধির মাধ্যমে 'স্মার্ট' লেনদেন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ এড়াতে সাব-রেজিস্ট্রারগণ এখন সরাসরি কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। প্রতিটি অফিসে তাদের নিজস্ব বিশ্বস্ত 'প্রতিনিধি' বা ক্যাশিয়ার থাকে। এই প্রতিনিধিরা মূলত দলিল লেখক সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেন। প্রতিদিন কোন লেখক কয়টি দলিল সম্পন্ন করলেন, কার জমির দলিলে কী 'ত্রুটি' আছে—তার নিখুঁত হিসাব চলে যায় এই প্রতিনিধিদের কাছে।
খ. অর্থ সংগ্রহ ও সমবন্টনের চেইন
দলিল লেখকরা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে 'সরকারি খরচ' ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ (যা স্থানীয় ভাষায় স্পিড মানি বা বকশিস বলা হয়) আদায় করেন। এই সংগৃহীত টাকা সন্ধ্যার পর বা অফিস সময়ের শেষে নির্দিষ্ট প্রতিনিধির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের বাসভবনে বা পূর্বনির্ধারিত গোপন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এই দুর্নীতির চেইনটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। অভিযোগ রয়েছে, শুধু সাব-রেজিস্ট্রারই নন, এই অবৈধ অর্থের ভাগ বাটোয়ারা হয় অফিসের হেডক্লার্ক, মুহুরি, পিয়ন, অফিস সহায়ক, এমনকি ঝাড়ুদার পর্যন্ত। পদবী ও ক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা হার নির্ধারণ করা থাকে। ফলে পুরো অফিসটিই একটি সমবায় ভিত্তিক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
[সেবাগ্রহীতা] ➔ [দালাল/দলিল লেখক] ➔ [সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিনিধি] ➔ [মূল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ]
গ. ছায়া সরকার হিসেবে 'দালাল চক্র'
প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মূল ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের বারান্দা পর্যন্ত সর্বত্রই সক্রিয় থাকে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী বা কর্মচারীদের আত্মীয়-স্বজনরাই এই চক্রের মূল হোতা। কোনো সাধারণ মানুষ যদি নিজে গিয়ে সরাসরি কাজ করতে চান, তবে তার দলিলে শত রকমের ভুল বা আইনি জটিলতা তৈরি করে ফাইল আটকে রাখা হয়। কিন্তু দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিলে, সেই জটিল দলিলই মুহূর্তের মধ্যে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অনুমোদিত হয়ে যায়। দালাল ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে এই অফিসে পা রাখাই যেন এক বিরাট অপরাধ।
হাইকোর্টের নির্দেশ বনাম সিসি ক্যামেরার শুভঙ্করের ফাঁকি
২০২৪ সালে মহামান্য হাইকোর্ট দেশের সকল সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্নীতি রোধে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। আদালতের এই রায়কে সাধারণ মানুষ সাধুবাদ জানালেও, বাস্তবে তা এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ডিজিটাল এই নজরদারিকে ফাঁকি দিতে দুর্নীতিবাজরা তাদের কৌশল বদলে ফেলেছে। সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে অফিসের ভেতরে, কিন্তু মূল লেনদেন এখন স্থানান্তরিত হয়েছে অফিসের বাইরে। পার্শ্ববর্তী চায়ের দোকান, পার্কিং লট, দালালের নিজস্ব অফিস কিংবা কানে কানে ফিসফিসানি করে ফয়সালা করার মাধ্যমে সিসি ক্যামেরাকে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে। প্রযুক্তি সিসি ক্যামেরায় বন্দি থাকলেও, দুর্নীতি রয়ে গেছে সিসি ক্যামেরার অন্ধ গলিতে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র: পাঁচবিবি অফিসের লঙ্কাকাণ্ড
দুর্নীতির এই দেশব্যাপী চিত্রের একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে। বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হোসেনের বিরুদ্ধে সমপ্রতি সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামরুল হোসেনের কার্যালয়ে ঘুষের টাকা নির্দিষ্ট না করে দিলে কোনো দলিলে স্বাক্ষর হয় না। দালাল চক্রের অবাধ যাতায়াত এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এক মহা-উৎসবে পরিণত হয়েছে এই অফিসটি। জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভিযোগ, সামান্য ত্রুটির অজুহাতে ফাইল আটকে মাসের পর মাস ঘোরানো এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
ত্রিমুখী আঘাত: সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির মারণ কামড়
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে। এর প্রভাব বহুমুখী এবং সুদূরপ্রসারী:
১. সাধারণ মানুষের কান্না: একজন নিম্নবিত্ত মানুষ যখন তার শেষ সম্বল দিয়ে জমি কেনেন, তখন রেজিস্ট্রেশনের সময় এই আকস্মিক অতিরিক্ত ২০-৫০ হাজার টাকার ধাক্কা তার পরিবারকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলে। টাকা দিতে না পারলে মেলে অবর্ণনীয় মানসিক হয়রানি।
২. রাষ্ট্রের বিশাল রাজস্ব ক্ষতি: ঘুষের মাধ্যমে যে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে, তার একটি পয়সাও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় না। উল্টো অনেক সময় উৎকোচের বিনিময়ে জমির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে (আন্ডার-ভ্যালুয়েশন) দলিল করা হয়, যার ফলে সরকার প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
৩. আইনি জটিলতা ও মামলার পাহাড়: টাকার বিনিময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই জাল, ভুয়া এবং বিতর্কিত দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পরবর্তীতে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং দেশের দেওয়ানি আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে চলা মামলার জট তৈরি হচ্ছে। যা সামাজিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
৪. বিনিয়োগে স্থবিরতা: যেকোনো শিল্পায়নের প্রথম শর্ত হলো জমি ক্রয়। কিন্তু বাংলাদেশের এই অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ভূমি ব্যবস্থার কারণে দেশি ও বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা এখানে পুঁজি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্ধকার থেকে আলোর পথ: মুক্তির ৭ দফা সুপারিশ
এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য শুধু সিসি ক্যামেরা বা সাময়িক বদলি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য:
|
ক্রমিক |
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ |
বাস্তবায়নের রূপরেখা |
|
০১ |
সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশন |
দলিল সাবমিশন, ফি প্রদান, ডিজিটাল সিগনেচার এবং চূড়ান্ত অনুমোদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনলাইন বা ক্যাশলেস করতে হবে, যাতে কর্মকর্তা ও নাগরিকের সরাসরি দেখা করার প্রয়োজন না হয়। |
|
০২ |
বার্ষিক সম্পদের হিসাব |
সাব-রেজিস্ট্রার থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে জমা ও অডিট করতে হবে। |
|
০৩ |
অভিযোগের দ্রুত বিচার |
জয়পুরহাটের পাঁচবিবিসহ দেশের যেসব অঞ্চলের সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তা দ্রুত তদন্ত করে বিভাগীয় ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। |
|
০৪ |
স্বাধীন বিশেষ টাস্কফোর্স |
শুধু দুদকের ওপর নির্ভর না করে সাবেক সৎ বিচারক, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সৎ আমলাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত আকস্মিক অভিযান (Surprise Raid) চালাতে হবে। |
|
০৫ |
অডিও-ভিডিও ক্লাউড নজরদারি |
শুধু সিসি ক্যামেরা নয়, অফিসের চারপাশের অডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এর লাইভ ফিড সরাসরি দুদকের কেন্দ্রীয় সার্ভারে ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষণ করতে হবে, স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা যাবে না। |
|
০৬ |
সৎ কর্মকর্তাদের প্রণোদনা |
যেসব কর্মকর্তা সততার সাথে সেবা দেবেন, তাদের বিশেষ প্রোমোশন, জাতীয় পুরস্কার এবং বিভাগীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা উৎসাহিত হন। |
|
০৭ |
দুদকের সংস্কার |
দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করে এর জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে দ্রুততম সময়ে মামলার চার্জশিট ও বিচার সম্পন্ন করা যায়। |
আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ
একটি প্রবাদ রয়েছে—"সর্ষের ভেতরেই যদি ভূত থাকে, তবে ভূত তাড়াবে কে?" ভূমি রেজিস্ট্রেশন খাতের এই কালো বিড়ালদের না থামালে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' থেকে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং আইনি কাঠামোর অভিভাবক হিসেবে আইনমন্ত্রীর কাছে এ দেশের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের আকুল আবেদন—অনুগ্রহ করে মাঠ পর্যায়ের এই চিত্রটি নিজে আমলে নিন।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবিসহ দেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যে অদৃশ্য সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন। সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল বন্ধ করতে এই খাতটিতে একটি আমূল ও ঐতিহাসিক শুদ্ধি অভিযান এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আকাশজমিন / আরআর