চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার এলাকায় জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র অপসারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। আজ সোমবার সকাল থেকে নগরীর টাইগারপাস, লালখান বাজার ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যাপক সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টাইগারপাস মোড়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাধারণ জনমনে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে আছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমি নিজেও বর্তমানে টাইগারপাস এলাকায় অবস্থান করছি। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেজন্য আমরা সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। রাষ্ট্রের আইনের প্রতি সবাইকে সম্মান দেখাতে হবে।’ মাঠে ঠিক কত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না জানিয়ে বলেন, ‘এই মুহূর্তে সংখ্যার বিষয়টি বলা যাবে না। তবে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের সংঘাত প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
এর আগে, আজ সোমবার সকালে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে নগরীর জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মিটিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গ্রাফিতি অপসারণের অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি দাবি করেন, নগরীর কোথাও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার কোনো নির্দেশ তিনি দেননি। মেয়র বলেন, ‘আপনারা চাইলে নিজে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পারেন, সেখানে কোনো গ্রাফিতি মোছা হয়নি। এ ধরনের কোনো নির্দেশ আমি কখনো দিইনি, ভবিষ্যতেও দেব না। জুলাই-আগস্টের চেতনা আমি নিজে অন্তরে ধারণ করি। দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে আমি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাঠে আছি। যারা জুলাই-আগস্টে বুক পেতে আন্দোলন করেছে, আমি অবশ্যই তাদের সর্বোচ্চ সম্মান করি।’
রবিবারের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, গতকাল রাতে কয়েকজন যুবক নিজেদের এনসিপির নেতা পরিচয় দিয়ে তার কাছে অভিযোগ করেন যে গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। তখন তিনি এই বিষয়টি মোটেও জানতেন না। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, চসিকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা তাদের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মূলত দেয়াল থেকে পুরনো পোস্টার অপসারণ করেছিল। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সেখানে গ্রাফিতি নয়, মূলত রাজনৈতিক পোস্টার ছিল। পোস্টারের আড়ালে থাকা কিছু গ্রাফিতি হয়তো চট করে দৃশ্যমান ছিল না। এখনও অনেক পিলারে সেই গ্রাফিতি অক্ষত রয়েছে, যা চাইলে যে কেউ দেখে আসতে পারেন। মেয়র বলেন, ‘গ্রাফিতি আঁকার জন্য যখন বৈষম্যবিরোধীর ছেলেরা এসেছে, আমি আমার তরফ থেকে তাদের রঙ ও উপকরণ দিয়ে আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা প্রদান করেছি। এমন নয় যে শুধু আজকে, কোটাবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই আমি তাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছি।’
উল্লেখ্য, গত রবিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় সিটি করপোরেশন অফিসের প্রবেশ মুখে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মোছা নিয়ে এনসিপি ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ এসে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেই ঘটনার জের ধরেই আজ পুরো এলাকা থমথমে রয়েছে।