পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে ঐতিহাসিক ধবলধোলাইয়ের পর বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় অবতীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। এই অবিস্মরণীয় সিলেট টেস্ট জয়ের পর এ সংস্করণের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে রীতিমতো বড় ধরনের ওলটপালট ঘটে গেছে। ক্রিকেটের পরাশক্তি প্রতিবেশীদের পেছনে ফেলে পয়েন্ট তালিকায় বড় লাফ দিয়েছে বাংলাদেশ দল। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর মিঠুন চক্রবর্তীর সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপের আদলে এখন বলাই যায়, ‘মারল পাকিস্তানকে, আর তার চরম টের পেল ভারত।’ পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় ভারতকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের কুলীন এই সংস্করণের বৈশ্বিক টেবিলে ভারত এখন নেমে গেছে ছয় নম্বরে, আর বাংলাদেশ সগৌরবে উঠে এসেছে পাঁচ নম্বরে। পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পর ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ এখন পাঁচে অবস্থান করছে, যেখানে ৪৮.১৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ছয়ে রয়েছে ভারত। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশড হওয়া পাকিস্তান দল মাত্র ৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ৯ দলের মধ্যে আটে পড়ে রয়েছে।
সিলেট টেস্টের এই রাজকীয় জয়ের পর শুধু পয়েন্ট তালিকাতেই বড় উত্থান ঘটেনি, বরং বলা চলে দেশের টেস্ট ক্রিকেটে এক অভূতপূর্ব নবজাগরণ ঘটেছে। কিছুদিন আগপর্যন্তও এ দেশের ক্রিকেট নিয়ে চরম হতাশ ছিলেন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। মাঠের চেয়ে ক্রিকেট বোর্ডে নানা প্রশাসনিক জটিলতা আর নেতিবাচক বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বেশি। ওদিকে হামজা চৌধুরীর কল্যাণে ফুটবল দিন দিন এগিয়ে আসায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্রিকেটের ক্রেজ কিছুটা কমতির দিকে ছিল। চায়ের দোকানেও ক্রিকেট নিয়ে সাধারণ মানুষের আলাপ-আলোচনায় আগের সেই ঝাঁজটা আর ছিল না। মনে হচ্ছিল, ব্যাট-বলের এই খেলাটিতে চারপাশে যেন শুধুই হতাশার কালো মেঘ। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক সিরিজ জয় যেন সেই জমাট বাঁধা হতাশার মাঝে এক প্রস্ফুটিত পদ্মফুল হয়ে আবির্ভূত হয়েছে, যার সুবাসে আবারও ক্রিকেট নিয়ে দারুণভাবে সরগরম হয়ে উঠেছে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ঝড় উঠেছে টংদোকানগুলোর চায়ের কাপেও।
যে বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটে একসময় বড় দলগুলো পাত্তাই দিতে চাইত না, সেই দলই কিনা এখন দাপটের সঙ্গে টানা চার টেস্টে হারিয়ে দিল পাকিস্তানকে। বিশ্ব ক্রিকেট যে এখন টাইগারদের সমীহ করতে বাধ্য, তা অস্ট্রেলিয়ান এক সংবাদমাধ্যমের করা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। পাকিস্তান আজ হেরে যাওয়ার আগেই তারা পোস্ট করেছিল, টেস্টে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ তে জয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াও এখন তীক্ষ্ণ চোখ রেখেছে এই সিরিজে। কারণ, আগামী মাসে সংক্ষিপ্ত সংস্করণের সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসবে তারা এবং আগস্টে বাংলাদেশ দল যাবে অস্ট্রেলিয়ায় পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ খেলতে। এখন আর বাংলাদেশকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ দল আসলেই অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছে। নইলে এই সিলেট টেস্টে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর কখনো ২৭৮ রান করতে পারত না। কিংবা ৪৩৭ রান তাড়া করতে নেমে একপর্যায়ে ভয় ধরিয়ে দেওয়া পাকিস্তানকে আজ পঞ্চম দিনের সকালে মাত্র ১৩ বলের ব্যবধানে অলআউট করতে পারত না। পেস বোলিং থেকে শুরু করে ফিল্ডিং ও ব্যাটিংয়ের সব বিভাগেই আজ বাংলাদেশের উন্নতি পুরোপুরি দৃশ্যমান। খেলোয়াড়দের এই মাঠের নিবেদন এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিক পরিবর্তনই দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে আবারও মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।