ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নারী টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব ছাড়লেন নিগার সুলতানা ইয়েমেনের মারিবে হুথিদের অস্ত্রের গুদামে বিমান হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ, বিশ্ববাজারে বাড়ছে উদ্বেগ আসিফ নজরুলের নির্দেশেই বিশ্বকাপে খেলেনি বাংলাদেশ: তদন্ত কমিটি স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে ইউএনডিপির সাহায্য চান এলজিআরডি মন্ত্রী যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলি হামলা, নিহত ১ ওবায়দুল কাদেরের সম্পদের পরিমাণ কত? সারের ডিলার কমিশন বাড়লেও কৃষকের কেনা দাম একই থাকছে কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইনের অপচেষ্টা প্রতিহত করলো বিজিবি পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্ব পরিমাপবিদ্যা আজ

প্রযুক্তির আড়ালে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চলছে ডিজিটাল তেল চুরি


  • আপলোড সময় : বুধবার ২০ মে, ২০২৬ সময় : ৩:৫৭ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

গাড়ির ফুয়েল ট্যাংক বা জ্বালানি পাত্র পূর্ণ করার জন্য অর্ডার করার পর দেশের সব পেট্রোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশনে ডিজিটাল ডিসপ্লের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে তাকিয়ে থাকেন সাধারণ গ্রাহকরা। মিটারে ৫ লিটার, ১০ লিটার কিংবা নির্দিষ্ট টাকার হিসাব নিখুঁতভাবে মিলতে দেখলেই অবলীলায় ধরে নেওয়া হয় যে ঠিক পরিমাণ জ্বালানিই সরবরাহ করা হয়েছে। কারণ, প্রযুক্তিনির্ভর এই সর্বাধুনিক ডিসপেন্সিং ইউনিটকে এ দেশের সাধারণ মানুষ সবসময় শতভাগ নির্ভুল বলেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন।

কিন্তু বিশ্ব পরিমাপবিদ্যা (মেট্রোলজি) দিবসের বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। প্রযুক্তির আড়ালে ডিজিটাল মিটারে সবকিছু বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক ও নিখুঁত দেখালেও বাস্তবে গ্রাহকরা পাচ্ছেন অনেক কম তেল! অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তিকেই এখন আরও নিখুঁত প্রতারণার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন অসাধু পাম্প মালিকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের দিনের মতো এখন আর পাম্পগুলোতে প্রকাশ্যে কোনো যান্ত্রিক বা অ্যানালগ কারচুপি খুব বেশি একটা হয় না। বর্তমানে প্রতারণার সিংহভাগই সম্পন্ন হচ্ছে সম্পূর্ণ সফটওয়্যারভিত্তিক কারসাজির মাধ্যমে। এর ফলে একজন সাধারণ বা সচেতন গ্রাহক তেল নেওয়ার সময় কোনোভাবেই বুঝতে পারেন না যে তাকে পরিমাপে তেল কম দেওয়া হচ্ছে। প্রতি লিটারে চুরির পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও, দিনে শত শত গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহকারী পাম্প মালিকদের কাছে দিনশেষে তা বিশাল অঙ্কের কোটি কোটি টাকার অবৈধ মুনাফায় পরিণত হয়।

প্রতি বছর ২০ মে বিশ্ব মেট্রোলজি (পরিমাপ) দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছরই নানা ধরনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালন করে। তবে ওজনে বা পরিমাপে ক্রেতাদের কম দেওয়া ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না বললেই চলে। সম্প্রতি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে এক চরম অস্থিরতা তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও এসে পড়ে। বিশেষ করে গত মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি সংকট মারাত্মক তীব্র হয়ে ওঠে।

সে সময় অবৈধ মজুত ঠেকাতে সরকারের কঠোর নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বিশেষ অভিযান শুরু করেন বিএসটিআই কর্মকর্তারা। সেই আকস্মিক অভিযানে গিয়ে তারা শুধু তেলের অবৈধ মজুতই নয়, বরং ওজনে মারাত্মক কম দেওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনাও হাতেনাতে শনাক্ত করেন। কর্মকর্তাদের ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রে তেলের অবৈধ মজুতের চেয়েও বহুগুণ ভয়ংকর ও ক্ষতিকর ছিল এই আধুনিক ডিজিটাল কারচুপি। কারণ, এই জালিয়াতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, অথচ সাধারণ গ্রাহক আজ পর্যন্ত তা টেরই পাচ্ছিলেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতেই বিএসটিআই তাদের অভিযান সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয় এবং তেল কম দেওয়ার এই ভয়ংকর প্রতারণাটি পুনরায় ধামাচাপা পড়ে যায়।

বিএসটিআই-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সাম্প্রতিক অভিযানের নথিপত্র ঘেঁটে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৪ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের গোসাইলডাঙ্গা এলাকার হাজী আবদুল আজিজ ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে ডিজেল ডিসপেন্সিং ইউনিটে কম তেল সরবরাহের প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিন একই এলাকার দাম্মাম ফিলিং স্টেশনেও একই অপরাধে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

গত ১৮ মার্চ নাসিরাবাদের বিখ্যাত বাদশা মিয়া অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পে যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ৫ লিটার ডিজেলে ১২০ মিলিলিটার কম সরবরাহ করছে! এই গুরুতর অপরাধে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া সীতাকুণ্ডের মা ফাতেমা সিএনজি ফিলিং স্টেশনকে ৪০ হাজার টাকা, কাটগড় এলাকার আম্বিয়া ফিলিং স্টেশনকে ৫ হাজার টাকা, বন্দর এলাকার মেসার্স আনোয়ার জাকারিয়া ফিলিং স্টেশনকে ৬০ হাজার টাকা এবং পাহাড়তলী এলাকার স্পিড টেক প্রাইভেট লিমিটেডকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

বিএসটিআই-এর কারিগরি কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক ডিসপেন্সিং ইউনিট মূলত সেন্সর, পালস জেনারেটর, কন্ট্রোল সার্কিট ও সফটওয়্যারের সমন্বয়ে কাজ করে। কারচুপির ক্ষেত্রে মূলত এই হিসাব প্রক্রিয়াতেই অবৈধ হস্তক্ষেপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিসপেন্সিং ইউনিটের মাদারবোর্ডে অতিরিক্ত ডেসিমাল চিপ বা পরিবর্তিত নতুন সার্কিট গোপনে বসানো হয়।

এতে মেশিনের ক্যালিব্রেশন সফটওয়্যার এমনভাবে কনফিগার করা হয় যে ডিসপ্লেতে ১ লিটার দেখালেও বাস্তবে সরবরাহ হয় কিছুটা কম। কিছু অসাধু চক্র আবার রিমোট কন্ট্রোল বা গোপন ইলেকট্রনিক সুইচ ব্যবহার করেও এই কারচুপি করে। অভিযানের সময় যাতে ধরা না পড়ে, সে জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় মেশিন ঠিকভাবে কাজ করে, কিন্তু ব্যস্ত সময়ে গোপনে কারচুপির বিশেষ মোড চালু করা হয়।

বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক (মেট্রোলজি) বুলবুল আহমেদ জয় বলেন, ‘তারা সফটওয়্যার সেটিংস এর ক্ষেত্রে মূলত এই ডিজিটাল জালিয়াতি করে। এজন্য আমরা সবসময় আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করি। অভিযানে আমাদের সাথে থাকা ৫ বা ১০ লিটারের একটি স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপক পাত্রে তেল পূর্ণ করে পাত্রের গায়ের নিখুঁত রিডিং স্কেলের সাথে পাম্পের ডিজিটাল স্ক্রিনের রিডিং মিলিয়ে দেখলে ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়।’ তবে এই তেলের কারচুপি ঠেকাতে ডিসপেন্সিং ইউনিটে থাকা মাদারবোর্ডের সফটওয়্যারগুলো বিএসটিআই-এর সরাসরি সার্ভার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এই বিষয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ দেশের সাধারণ গ্রাহকেরা একেবারেই অসহায়। তারা বাইরে থেকে বুঝবে কীভাবে যে ভেতরের মিটারে মাদারবোর্ডের গরমিল রয়েছে। এই চরম কারসাজি দেখার ও নিয়মিত তদারকি করার একমাত্র আইনি দায়িত্ব বিএসটিআই-এর।

প্রশাসন যদি এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ গ্রাহকদের কিছুই করার থাকে না।’ অন্যদিকে, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক জানান, এ ধরনের পরিমাপের ডিজিটাল চুরির সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ তারা খুব একটা পান না, তবে অভিযোগ পেলে সামনেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৮৭৫ সালের ২০ মে ফ্রান্সের প্যারিসে ঐতিহাসিক মিটার কনভেনশন স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমাপ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেই বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি’। তবে সচেতন মহল বলছেন, কেবল প্রতীকী আলোচনা সভা বা সেমিনার নয়, ডিজিটাল যুগের এই ডিজিটাল প্রতারণা ঠেকাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আইনের কঠোরতম বাস্তবায়ন।



এ সম্পর্কিত আরো খবর