নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে দীর্ঘদিন পর প্রকাশিত এক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কমিটির দাবি, ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনো যৌথ বা সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি; বরং এককভাবে নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ দলের গ্রুপ পর্বের মোট চারটি ম্যাচ। এর মধ্যে তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সেখানে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের লিখিত অনুরোধ জানায়। আইসিসি বিসিবির সেই অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। ফলে বিসিবিও সরকারের নির্দেশিত এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত সম্পন্ন করার পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে না পাঠানোর এ সিদ্ধান্তটি কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কোনো প্রশাসনিক বা ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুভব করেননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এমনকি ক্রিকেটারদের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে আসিফ নজরুল শুধুমাত্র নিজের একক সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দিয়েছিলেন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো এত বড় আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।’ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয় ও ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘প্রতিবেদনে যে একজন ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, তিনি তৎকালীন স্পোর্টসের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।’
তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যের মধ্যে চরম ভিন্নতা ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আসিফ নজরুল দাবি করেছিলেন যে, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়েছেন। সেদিন তিনি বলেন, বিশ্বকাপে খেলতে না পারার কারণে কোনো অনুশোচনা বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই, কারণ দেশের মর্যাদা ও ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার প্রশ্নে খেলোয়াড়েরা আত্মত্যাগ করেছেন।
অথচ এর আগে আসিফ নজরুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেটারদের ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সম্পূর্ণ সিদ্ধান্তের দায় বোর্ড ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি মনে করে, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং খেলোয়াড়দের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, যাতে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।